আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে, শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুরে বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতা অংশ নেয়।
হাদির জানাজায় আসলে কত লোক হয়েছে, তা বাস্তবে সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে, মনে করা হচ্ছে- হাদির জানাজায় কয়েক লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছে।
বুয়েট থেকে জানাজায় অংশ নেওয়া একদল শিক্ষার্থী একটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, হাদির জানাজায় প্রায় ১০ মানুষ অংশ নিয়েছে।
তারা বলছেন, 'নিজেদের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে এবং বিভিন্ন পয়েন্টে উপস্থিত মানুষের সাথে কথা বলে আমরা হিসাব করেছি যে আজকে শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর জানাজায় উপস্থিত মানুষ ১ লাখ ৫০ হাজার স্কয়ার মিটারের মতো জায়গা দখল করেছিল। এরকম ঘনত্বের জনসমাগমে উপস্থিত মোট মানুষের সংখ্যা ১ মিলিয়ন বা ১০ লক্ষের কাছাকাছি (অন্ততপক্ষে ৮ লক্ষের বেশি)।
তারা আরও বলছেন, সংসদ ভবনের পূর্ব দিকের মাঠে উপস্থিত বুয়েটের বেশ কিছু শিক্ষার্থী নিশ্চিত করেছেন, জানাজার পূর্বে ঐ মাঠও পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অনেকে ইনবক্সে ছবি এবং ভিডিও পাঠিয়েছে। ড্রোনশটগুলো জানাজার আধাঘণ্টা আগের হওয়ায় ঐ মাঠ খালি দেখাচ্ছিল। সেটা বিবেচনায় নিলে জানাজায় উপস্থিত মানুষ ২ লাখ স্কয়ার মিটারের মতো যায়গা দখল করেছিল। এরকম ঘনত্বের জনসমাগমে উপস্থিত মোট মানুষের সংখ্যা ১ দশমিক ২ মিলিয়ন বা ১২ লক্ষের কাছাকাছি (অন্ততপক্ষে ১ মিলিয়ন বা ১০ লক্ষের বেশি)।
অন্যদিকে, বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবির সাংবাদিক সাইফ হাসনাত এক ফেসবুক পোস্টে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, হাদির জানাজায় সাড়ে ৪ থেকে ৬ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছেন। সাইফ হাসনাত প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেন।
সাইফ হাসনাতের ভাষ্য, আমরা একটু পপুলেশন বা ক্রাউড ডেনসিটি আর অন্যান্য ডাটা এনালাইসিস করে দেখতে পারি। আর একটু খেয়াল রাখবেন এইটা ধারণা, আর ধারণা বা গেসিং হলো একটা ইনএক্সাক্ট সাইন্স।
হাদির জানাজায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা আর মানিক মিয়া এভিনিউতে যে জনস্রোত নেমেছে, তা মনে হয় একবারই হয়। তাহলে চলুন জিও-স্পেশাল ডাটা আর ক্রাউড ডেনসিটি সাইন্স দিয়ে এই জনসমুদ্রের একটা হিসাব বের করার চেষ্টা করি।
জানাজার নানা ড্রোন শট আর এলাকার আয়তন বলছে— দক্ষিণ প্লাজার দুই পাশের যে বিশাল ঘাসের মাঠ, স্যাটেলাইট মেজারমেন্ট অনুযায়ী, ওই এলাকার মোট আয়তন প্রায় ১৪ থেকে ১৫ একর (৫৮ হাজার স্কয়ার মিটার)।
সাধারণ সমাবেশে মানুষ কিছুটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কিন্তু আজকের জানাজার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, তিল ধারণের ঠাঁই নেই—মানুষ একদম গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সে হিসাবে এই হাই-ডেনসিটি (প্রতি স্কয়ার মিটারে ৪-৫ জন) অবস্থায় শুধু এই দুই ঘাসের মাঠেই প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ থাকার সম্ভাবনা আছে।
আর পাকা চত্বর বা মেইন প্লাজা— দুই ঘাসের মাঠের মাঝখানের পাকা র্যাম্প আর সিঁড়ির অংশটুকু প্রায় ২০ হাজার স্কয়ার মিটার। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এই জায়গাটুকুও সাদা টুপিতে ধবধবে হয়ে আছে।
এখানে আরও প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ মানুষ থাকা সম্ভব।
তারপর আসে মানিক মিয়া এভিনিউ— সংসদ ভবনের গেট থেকে আড়ং লিংক রোড- এদিকে খেজুর বাগান পর্যন্ত পুরো রাস্তাটি জনাকীর্ণ। এই ১০ একর রাস্তায় (৪০ হাজার স্কয়ার মিটার) সলিড জ্যাম প্যাকড অবস্থায়— এখানে আরও অন্তত ১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ মানুষ।
আজকের এই অভূতপূর্ব দৃশ্যে—প্লাজা, লন, আর মেইন রোড মিলিয়ে—একটি অতি কনজার্ভেটিভ হিসাবেও সাড়ে ৪ লক্ষ থেকে ৬ লক্ষ মানুষ এই জানাজায় শরিক হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। আর যদি আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোর ভিড় ধরা হয়, তবে সংখ্যাটা আরও বড় হতে পারে। সম্ভবত ৬ থেকে ৭ লাখ হতে পারে।
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কির সামনে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদির ওপর আক্রমণ হয়। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে এসে দুজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
একপর্যায়ে পরিবারের ইচ্ছায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাদিকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়। হাদির মরদেহ শুক্রবার সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়। শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
/এমএইচআর