দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, লিখেছেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। বাংলাদেশের চিন্তাজগতের এই অনন্য দিশারির ৯৪তম জন্মদিন আজ। তিনি শুধু একজন লেখক নন, তিনি নির্ভীক মার্কসবাদী চিন্তাবিদ এবং বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী।
বদরুদ্দীন উমর বিশ্বাস করতেন, লেখা মানেই লড়াই। তাই তার কলম কখনো বিশ্রাম নেয়নি। শতাধিক বই, অসংখ্য প্রবন্ধ আর নিবন্ধে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস আর সংস্কৃতির গভীর সত্যগুলো।
ইতিহাসকে নতুন চোখে দেখা
উমরের লেখা ইতিহাস অন্যরকম। তিনি ইতিহাসকে ওপর থেকে দেখেননি, দেখেছেন সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে। তার কাছে ইতিহাসের আসল নায়ক কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত তিন খণ্ডের ‘পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ পড়লে সেটা স্পষ্ট হয়। ভাষা আন্দোলনকে তিনি কয়েকজন নেতার গল্প বানাননি, বরং এটাকে গণমানুষের চেতনা জাগরণের আন্দোলন হিসেবে দেখিয়েছেন।
এভাবেই দুই খণ্ডের ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ গ্রন্থে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ইতিহাসকে দেখিয়েছেন সৎ ও নিরপেক্ষ চোখে। তার এই বইগুলো আজও আমাদের পথ দেখায়।
সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখা
ষাটের দশকে লেখা তার তিনটি বই-‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’ ও ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’-বাংলাদেশের চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন এনেছিল। এসব লেখায় তিনি খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতা কোথা থেকে আসে আর কীভাবে রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে তা জন্ম নেয়।
এই লেখাগুলো পড়েই অনেক মানুষ বুঝতে পেরেছেন, বাঙালির জাতীয়তাবাদ আসলে কীভাবে গড়ে উঠেছে। বলা যায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলতে বদরুদ্দীন উমরের বড় ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষকতা ছেড়ে অধিকার আদায়ে অংশগ্রহণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা উমর খুব অল্প বয়সেই শিক্ষকতা শুরু করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার একাডেমিক জীবন ছিল উজ্জ্বল।
কিন্তু ১৯৬৮ সালে তিনি সব ছেড়ে দেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, শুধু শ্রেণিকক্ষে থেকে সত্য বলা সম্ভব নয়। তিনি যুক্ত হন কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রাজনীতিতে। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন একজন লড়াকু বুদ্ধিজীবী।
আজও থামেননি
এখনো বদরুদ্দীন উমর সক্রিয়। তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ চার দশক ধরে তিনি ‘সংস্কৃতি’ নামে একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করছেন, যা বামপন্থি চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা।
কেন তিনি আলাদা
উমরের লেখা পড়লে বোঝা যায়, তিনি কখনো ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়াননি। তিনি সব সময় সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন। বড় পুঁজিপতি, লুটেরা শ্রেণি, ফ্যাসিবাদ-সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তার চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ সমাজের বৈষম্য এখনো শেষ হয়নি।
তিনি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ বার্ধক্যজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
বদরুদ্দীন উমর শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি ধারার নাম। সত্য কথা বলার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি আর মানুষের পক্ষে থাকার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও আমাদের দরকার।
জন্মদিনে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন চিন্তাবিদকে নয়-একজন নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামী মানুষকে স্মরণ করা।
/ইউএমএইচ