অভিনেতা আব্দুল কাদেরকে হারানোর পাঁচ বছর হলো আজ। সময়ের হিসেবে অনেকটা পথ, কিন্তু দর্শকের স্মৃতিতে তিনি এখনও ঠিক আগের মতোই জীবন্ত-সংলাপে, অভিব্যক্তিতে, তার সেই চেনা উপস্থিতিতে। আজও তার কাজের প্রশংসা পুরো দেশজুড়ে।
অভিনয়ের যাত্রা
আব্দুল কাদের ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি খুব বেশি উচ্চকণ্ঠ না হয়েও দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার অভিনয়ের শক্তি ছিল সংযমে, চোখের ভাষায় আর সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে তৈরি হওয়া নীরবতায়। টিভি পর্দায় তিনি কখনও দর্শকের হৃদয়ে ভয় জাগিয়ে তুলতেন, কখনও কৌতুকের ছলে হাস্যরসের সৃষ্টি করতেন, আবার কখনও দর্শকের চোখের জলের কারণ হতেন-চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙে গড়ে নিতে জানতেন তিনি।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত কিংবদন্তি ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এ ‘বদি’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখা আর বরকতুল্লাহর পরিচালনায় নির্মিত সেই নাটকে বাকের ভাইয়ের সহচর হিসেবে তার উপস্থিতি ছিল অনবদ্য। খুব বেশি সংলাপ না থাকলেও, বদিকে দর্শক আলাদা করে মনে রেখেছে-এটাই একজন প্রকৃত অভিনেতার সাফল্য।
হুমায়ূন আহমেদের নাটকে নির্ভরযোগ্য মুখ
হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকটি নাটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন আব্দুল কাদের। হুমায়ূনের নাটকে যে ধরনের ‘চেনা কিন্তু আলাদা’ চরিত্রগুলো থাকে, সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে কাদের ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একজন শিল্পী। তার অভিনয়ে কখনও অতিনাটকীয়তা ছিল না, ছিল বাস্তবতার ছাপ-যা দর্শককে চরিত্রের সঙ্গে সহজেই একাত্ম করে তুলত।
‘ইত্যাদি’ থেকে বড় পর্দা
টেলিভিশনের পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে নিয়মিত শিল্পী হিসেবেও তিনি দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন। ইত্যাদির মঞ্চে তার অভিনয় ছিল হালকা, রসিকতাপূর্ণ, কিন্তু কখনওই ভাঁড়ামো নয়।
বড় পর্দাতেও তিনি কাজ করেছেন। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রং নাম্বার’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। যদিও সিনেমায় তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম, তবু যেখানে ছিলেন, সেখানেই নিজের ছাপ রেখে গেছেন।
সম্মাননা আর স্বীকৃতি
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে আব্দুল কাদের পেয়েছেন টেনাশিনাস পুরস্কার, মহানগরী সংস্কৃত গোষ্ঠী পুরস্কার, জাদুকর পিসি সরকার পুরস্কার ও টেলিভিশন শ্রোতা ফোরাম পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি সম্মাননা। তবে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল দর্শকের ভালোবাসা-যা আজও অটুট।
বিদায়ের পাঁচ বছর পর
২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। দীর্ঘ অসুস্থতা, ক্যানসার ও করোনার সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানেন এই শিল্পী। তার চলে যাওয়ার খবর তখন পুরো নাট্যাঙ্গনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
পাঁচ বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়, আব্দুল কাদের ছিলেন সেই ধরনের অভিনেতা, যাদের শূন্যতা সহজে পূরণ হয় না। তিনি হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে খুব বেশি থাকতেন না, কিন্তু গল্পের ভেতরে ঢুকে চরিত্রকে এমনভাবে দাঁড় করাতেন, যা দর্শক ভুলতে পারবে না।
আজ তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি একজন গুণী, পরিশ্রমী ও নিভৃতচারী অভিনেতাকে-যিনি নীরবে অভিনয় করে গেছেন, আর নীরবেই হয়ে উঠেছেন বাংলা নাটকের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
/ইউএমএইচ