সোমালিল্যান্ড কোথায়, কেন শুধু ইসরায়েল এই ‘দেশ’কে স্বীকৃতি দিয়েছে
মারিয়া হাসিবা
ফিচার
ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল ‘হর্ন অব আফ্রিকায়’ অবস্থিত এই
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল এই স্বঘোষিত অঞ্চলটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল ‘হর্ন অব আফ্রিকায়’ অবস্থিত এই স্বঘোষিত অঞ্চলটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আব্দিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি এক যৌথ বিবৃতিতে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দেন। তবে ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি ঘিরে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সোমালিয়া, চীন ও মিশর এই পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
সোমালিল্যান্ড কোথায়
সোমালিল্যান্ড সোমালিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। এটি ছিল এক সময়কার ব্রিটিশশাসিত অঞ্চল। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর অঞ্চলটি একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর থেকে সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব সরকার, সংসদ, মুদ্রা, পতাকা ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে সোমালিল্যান্ড কখনোই স্বীকৃতি পায়নি।
২৬ নভেম্বর ২০২৪ সালে সোমালিয়ার মোগাদিসুতে ২০২৬ সালের এক ব্যক্তি–এক ভোট ভিত্তিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে সর্বজনীন ভোটাধিকার চালুর সরকারি পরিকল্পনার সমর্থনে আয়োজিত এক মিছিলে মানুষ অংশ নেন।
সোমালিয়ার স্বৈরশাসক সিয়াদ বারের শাসনামলে ১৯৮০–এর দশকে উত্তরাঞ্চলে (অর্থাৎ সোমালিল্যান্ডে) ব্যাপক দমন-পীড়নের পর এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা চলেছে। তবে ১৯৯০–এর দশকের শেষ দিক থেকে সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা লাভ করলেও দক্ষিণ সোমালিয়ার অনেক অংশের চেয়ে শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার এখনো সোমালিল্যান্ডকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে।
কেন শুধু ইসরায়েল স্বীকৃতি দিলো?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি মূলত কৌশলগত ও সামরিক স্বার্থনির্ভর। সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে, যা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর গাজা সিটি থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে সরিয়ে নেওয়ার সময় একটি ট্রাকে মানুষজন তাদের ব্যক্তিগত মালপত্রসহ যাত্রা করছে।
এ অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে পারলে ইসরায়েল-ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা নজরদারি করতে পারবে এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী ইসরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে পারবে। এর সঙ্গে বারবেরা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আফ্রিকান বন্দর ব্যবহার করে নতুন সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে পারবে।
এছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে সোমালিল্যান্ড নিজস্ব আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। এরপরই ইসরায়েলি নজরদারি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সহযোগিতায় সোমালিল্যান্ড এ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হয়। এমনকি আল-জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ফিলিস্তিনিদের গাজা উপত্যকা থেকে সরিয়ে সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও করছে ইসরায়েল।
চীন ও মিশরের উদ্বেগ
চীন এই স্বীকৃতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের মতে, এটি সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে চীনের সামুদ্রিক স্বার্থের জন্য হুমকি।
সোমালিল্যান্ডের অবস্থান
চীন সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও মিশরের সঙ্গে একযোগে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। মিশর সতর্ক করে বলেছে, কোনো দেশের আঞ্চলিক অংশকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক।
ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতি নিয়ে আশঙ্কা
কিছু আঞ্চলিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা দাবি করেছে, ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে বিবেচনা করছে। যদিও ইসরায়েল এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের বারবারা অঞ্চল
এর আগে চলতি বছরে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক আফ্রিকায় সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনার যোগসূত্র রয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
এর প্রেক্ষিতে মিশর, তুরস্ক, সোমালিয়া ও জিবুতির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ ফোনালাপে এমন যেকোনো পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন।
সোমালিল্যান্ডের স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষাবিদ আহমেদ দাহির সাবান বলেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর আমরা কখনোই গ্রহণ করব না। এটি আমাদের অঞ্চলে সহিংসতা ও উগ্রবাদ বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আল-শাবাব ও ‘আইএস সোমালিয়া’র মতো জঙ্গিগোষ্ঠী এই ইস্যুকে প্রচারণা ও নিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমালিল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি আব্দিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহর সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন, একই সময়ে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা স্বাক্ষর করছেন, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫।
মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করার যেকোনো পরিকল্পনার প্রতি কঠোর ও স্পষ্টভাবে আপত্তি জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এ ধরনের পরিকল্পনা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কাছেই সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব ইসরায়েলের ঘোষণার পরপরই সোমালিয়া একে ‘অবৈধ ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। এছাড়া তুরস্ক, জিবুতি ও মিশরের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে মোগাদিসু।
যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ স্বীকৃতির পক্ষে মত দিলেও এখনো ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নও সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়নি।
সোমালি নারীরা সোমালিল্যান্ডের পতাকা নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অংশ নিচ্ছেন।
ইসরায়েলের স্বীকৃতি সোমালিল্যান্ডকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে, কিন্তু এটি এখনো বৈশ্বিক স্বীকৃতি থেকে অনেক দূরে। চীন, মিশর ও আফ্রিকার দেশগুলোর বিরোধিতা, সোমালিয়ার আপত্তি এবং ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে হর্ন অব আফ্রিকার এ অঞ্চল নতুন করে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে পড়েছে।
ইসরায়েল যেখানে কৌশলগত সুবিধা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে, সেখানে চীন ও মিশর একে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে দেখছে।