রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-নির্বাসন কখনও শেষ অধ্যায় নয়। সামরিক অভ্যুত্থান, স্বৈরশাসন কিংবা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে বহু নেতা নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও সময়ের পরিবর্তন, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার বদলে অনেকেই আবার ফিরে এসেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। এসব প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত জয় নয়, অনেক সময় তা পুরো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দিকবদলের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের পর আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে এমন বহু নেতা রয়েছেন, যারা দীর্ঘ নির্বাসনের জীবন কাটিয়ে আবার রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
বেনজির ভুট্টো
পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো সামরিক শাসক জিয়া-উল-হকের আমলে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে যান। ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে তিনি গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েন। পরবর্তী সময়ে আবার মামলা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশ ছাড়লেও ২০০৭ সালে ফের পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের দুই মাসের মধ্যেই তিনি প্রাণঘাতী হামলায় নিহত হন।
নওয়াজ শরিফ
১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নওয়াজ শরিফ গ্রেফতার ও দণ্ডিত হন। সৌদি আরবে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০০৭ সালে দেশে ফেরেন। পরবর্তীতে আবার মামলায় জড়িয়ে লন্ডনে অবস্থান করলেও ২০২৩ সালে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে আগের দণ্ড বাতিল হয় এবং তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন।
অং সান সু চি
মিয়ানমারের গণতন্ত্র আন্দোলনের প্রতীক অং সান সু চি দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ও কার্যত নির্বাসিত জীবন কাটান। বিদেশে শিক্ষা ও সংসার জীবনের পর ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছান। যদিও ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার নেতৃত্বের অবসান ঘটে এবং বর্তমানে তিনি আটক রয়েছেন।
থাকসিন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দুর্নীতির মামলায় সাজা এড়াতে ২০০৮ সালে দেশত্যাগ করেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসনের পর ২০২৩ সালে দেশে ফিরে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। পরে রাজকীয় ক্ষমায় সাজা কমে এবং প্যারোলে মুক্তি পেলেও আইনি জটিলতা এখনো তার পিছু ছাড়েনি।
রুহুল্লাহ খোমেনি
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের কেন্দ্রীয় চরিত্র আয়াতুল্লাহ খোমেনি ১৪ বছরের বেশি সময় নির্বাসনে কাটান। তুরস্ক, ইরাক ও ফ্রান্সে অবস্থান করে তিনি শাহবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেন। ১৯৭৯ সালে তার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই ইরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইয়াসির আরাফাত
প্রায় ২৭ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৪ সালে অসলো চুক্তির অংশ হিসেবে নিজ ভূখণ্ডে ফিরে আসেন। তার প্রত্যাবর্তন ফিলিস্তিনি স্বশাসনের সূচনা করলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
নুরি আল-মালিকি
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর নির্বাসনে কাটান নুরি আল-মালিকি। ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর দেশে ফিরে দ্রুতই ইরাকের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন এবং ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন।
নেলসন ম্যান্ডেলা
নির্বাসনের বদলে ২৭ বছরের কারাবাস-তবুও ম্যান্ডেলার প্রত্যাবর্তন ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯৯০ সালে মুক্তির পর তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এলেন জনসন সারলিফ
লাইবেরিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সারলিফ একাধিকবার নির্বাসন ও কারাবরণের শিকার হন। দীর্ঘ প্রবাস শেষে দেশে ফিরে ২০০৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আফ্রিকার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেন।
আলাসনে আউত্তারা
আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট আলাসনে আউত্তারা রাজনৈতিক ও জাতিগত বিরোধের কারণে একাধিকবার নির্বাসনে যান। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় দেশে ফিরে ২০১০ সালের নির্বাচনে জয়ী হন এবং রক্তক্ষয়ী সংকট শেষে ২০১১ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
চার্লস দ্য গল
১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির কাছে ফ্রান্স পরাজিত হলে চার্লস দ্য গল লন্ডনে নির্বাসনে যান। সেখান থেকে তিনি ‘ফ্রি ফ্রান্স’ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে তিনি জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটের সময় তাকে আবার ক্ষমতায় আনা হয় এবং তিনি ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। তার প্রত্যাবর্তন আধুনিক ফরাসি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়।
হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন
১৯৫৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পেরন প্রায় ১৮ বছর নির্বাসনে ছিলেন। স্পেনসহ একাধিক দেশে অবস্থানকালে তিনি শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হন। ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রেসিডেন্ট হন। তার রাজনৈতিক আদর্শ ‘পেরোনিজম’ আজও আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব রাখে। তবে তার শাসনকাল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় ভরা ছিল।
এভো মোরালেস
২০১৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে এভো মোরালেস দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি মেক্সিকো ও পরে আর্জেন্টিনায় নির্বাসনে যান। নির্বাসনে থেকেও তিনি নিজ দলের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ছিলেন। পরে ২০২০ সালের নির্বাচনে তার দল এমএএস বিপুল জয় পেলে তিনি দেশে ফিরে আসেন। যদিও তিনি আবার প্রেসিডেন্ট হননি, তবে বলিভিয়ার রাজনীতিতে তার প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
হুয়ান গুয়াইদো
নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে গুয়াইদো বারবার বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। যদিও তিনি নির্বাসনে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারেননি, তবে তার বিদেশযাত্রা ও প্রত্যাবর্তন ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করে। এই উদাহরণ দেখায়, সব নির্বাসনই সফল প্রত্যাবর্তনে রূপ নেয় না।
ভ্লাদিমির লেনিন
জার শাসনের বিরোধিতা করতে গিয়ে লেনিন সুইজারল্যান্ডে নির্বাসনে ছিলেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর জার্মানির সহায়তায় তিনি ‘সিলড ট্রেন’-এ করে রাশিয়ায় ফেরেন। তার প্রত্যাবর্তনই অক্টোবর বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়।
অয়ুং সান
ব্রিটিশ শাসনের সময় অয়ুং সান বিদেশে অবস্থান করে স্বাধীনতা আন্দোলনের কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করেন। দেশে ফিরে তিনি বার্মার স্বাধীনতার রূপরেখা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। যদিও তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই নিহত হন, তার প্রত্যাবর্তন মিয়ানমারের স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করে।
সিমোন বলিভার
স্প্যানিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার পর একাধিকবার নির্বাসনে যান বলিভার। প্রতিবারই তিনি ফিরে এসে নতুন করে সামরিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম সংগঠিত করেন। তার প্রত্যাবর্তনের ফলেই ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও বলিভিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাসন অনেক সময় রাজনীতিবিদদের জন্য পরাজয় নয়, বরং নতুন করে কৌশল সাজানোর সুযোগ। ইতিহাসের এসব প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে-রাজনীতিতে নির্বাসন শেষ কথা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতায় ফেরার দীর্ঘ পথের একটি অধ্যায় মাত্র।
/ইউএমএইচ