বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন। এটি শুধু একটি ট্রফি নয়, এটি একটি প্রজন্মের সাহসী অর্জন। সেই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম একজন পঞ্চগড়ের বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। খালি পায়ে গ্রামের মাঠে বোলিং করা যে ছেলেটার স্বপ্ন ছিল একদিন দেশের জার্সিতে খেলবে, সেই শরিফুল আজ বাংলাদেশের পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। গ্রাম থেকে শহর, একাডেমি থেকে জাতীয় দল, ইনজুরি থেকে ফিরে আসা- সব মিলিয়ে তার ক্রিকেটজীবন একটানা সংগ্রামের গল্প। চলমান বিপিএলের ব্যস্ততার মাঝেই মাঠের বাইরের জীবন, কোচ, দল, ভবিষ্যৎ আর বাংলাদেশের পেসারদের বাস্তবতা নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বললেন এই বাঁহাতি পেসার।
পেছনে ফিরে তাকালে শরিফুলের চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে গ্রামের ছবি। পঞ্চগড়ের টান এখনও তাকে টানে। সুযোগ পেলেই ছুটে যান মা-মাটির কাছে। যেখানে তার শেকড়, বন্ধু আর আড্ডা। গ্রামের কথা উঠতেই একগাল হাসি নিয়ে শরিফুল বললেন, ‘অবশ্যই ভালো লাগে। যখন যাই তখন সবাই মিলে অনেক মজা করি। আমাদের গ্রামবাসী, ফ্রেন্ড সার্কেল, মামা, ভাগনে, ভাই সবাই মিলে। সত্যি কথা বলতে পঞ্চগড় যখন যাই, তখন খুব ভালো লাগে। মেন্টাল রিফ্রেশমেন্ট হয়।’
নিজের বোলিং ক্যারিয়ার গড়ে উঠার পেছনে কোচদের অবদান স্মরণ করতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে শরিফুলের। বিশেষ করে সদ্য প্রয়াত কোচ মাহবুব আলী জাকির কথা আলাদা করে উল্লেখ করেন। যিনি ছিলেন ২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে শরিফুলদের বোলিং কোচ। যার মমতায় আজ এতদূর।
তাকে নিয়ে শরিফুল বললেন, ‘প্রথমত জাকি স্যারকে আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রায় তিন বছর কাজ করেছি। আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। শুধু আমি না, আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যাচ বা বাংলাদেশের যত ফাস্ট বোলার এসেছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে তার হাত দিয়েই এসেছে। সবাই তাকে খুব মিস করে।’
চলমান বিপিএলে শরিফুল খেলছেন চট্টগ্রাম রয়্যালসের হয়ে। নিজের দল ও প্লে-অফ ভাবনা নিয়ে শরিফুলের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ বাস্তববাদী। বড় লক্ষ্য থাকলেও আপাতত মনোযোগ ম্যাচ বাই ম্যাচেই, ‘প্রতিটা টিমই প্লে-অফে যেতে চায়, চ্যাম্পিয়ন হতে চায়। কিন্তু আমরা অতদূর ভাবছি না। ম্যাচ বাই ম্যাচ চিন্তা করছি। আমরা অ্যাজ এ টিম খুব ভালো বন্ডিংয়ে আছি। সবাই ফর্মে আছে, অভিজ্ঞতাও আছে। আমার মনে হয় আমরা ভালো ফাইট দিতে পারব।’
একই দলে একাধিক জাতীয় মানের বোলার থাকা নিয়ে তিনি দেখেন ইতিবাচক দিক, ‘শেখ মেহেদী ভাই, তানভীর ভাই, অঙ্কন, মুগ্ধ, রনি সবাই ভালো পারফর্ম করছে। এটা খুব ইতিবাচক ব্যাপার। ভালো বোলারদের সঙ্গে খেললে নিজের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।’
বিশ্বকাপের স্মৃতি, ইনজুরি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে শরিফুলের কণ্ঠে থাকে বাস্তবতা আর প্রত্যাশার মিশেল। এই বিপিএলের পরই ভারত ও শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ রয়েছে। সব ঠিক থাকলে সেই দলের একজন হবেন শরিফুল। বিশ্বকাপ ভাবনা নিয়ে বলেন, ‘আগের বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে খেলতে পারিনি। এবার অবশ্যই ইচ্ছা আছে নিজের সেরাটা দেওয়ার। তবে আগে বিপিএলটা ভালোভাবে শেষ করতে চাই। পরে কী হবে সেটা আল্লাহ জানেন। সুযোগ পেলে ইনশাআল্লাহ বেস্টটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
মাঠে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারার আনন্দ একজন প্রকৃত বোলারের মানসিকতাই তুলে ধরে বলে মনে করেন শরিফুল, ‘একটা বোলার যখন তার প্ল্যান এক্সিকিউট করতে পারে, তখন অনেক আনন্দ লাগে। নেটে যেটা করি ম্যাচে সেটার ফল পেলে আত্মতৃপ্তি আসে।’
নতুন বল কিংবা ডেথ ওভার- দুই ফেজেই তার মানসিকতা পরিষ্কার, ‘মাইন্ডসেট থাকে টিম যেটা ডিমান্ড করে। কখনো ইয়র্কার, কখনো স্লোয়ার। সাকসেস সবসময় আসে না, কিন্তু চেষ্টা আর প্র্যাকটিসটা জরুরি। আর ক্রিকেট মানেই ইনজয় করে খেলতে হবে।’
শরিফুল নিজেকে একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। যার জন্য করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। তবে পঞ্চগড় থেকে আরেক শরিফুল উঠে আসার পথ যে এখনও কঠিন সেটাও অকপটে স্বীকার করেন তিনি, ‘ওখানে ভালো উইকেট নেই, ভালো প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটিস নেই। তবু আশা রাখি আমার থেকেও ভালো বোলার বের হবে। আমি চাই বিভাগীয় পর্যায়ে যেন উত্তরবঙ্গে ভালো ফ্যাসিলিটিস দেওয়া হয়।’
একটা সময় বাংলাদেশ দলে ছিল পেসারদের ঘাটতি। তবে বর্তমানে বেশ কয়েকজন পেসার আছেন যারা বিশ্বমানের। পাইপলাইনেও রয়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের পেসারদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে শরিফুলের মূল্যায়ন আশাবাদী, ‘এখন বাংলাদেশে ফাস্ট বোলারদের মধ্যে হেলদি কম্পিটিশন আছে। যে যত ভালো খেলবে, সে সুযোগ পাবে। ইনজুরি হলে রিহ্যাব আছে, ব্যাকআপ আছে। সব মিলিয়ে পেসার হিসেবে বাংলাদেশে লাইফ গুড।’
শরিফুল ইসলামের কথায় স্পষ্ট, এই যাত্রা কেবল তার একার নয়। শেকড়ের টান, কোচের শিক্ষা, প্রতিযোগিতার চাপ আর স্বপ্নের তাড়না মিলিয়েই তার লড়াই। আর সেই লড়াই চলছেই বল হাতে, সামনে তাকিয়ে, বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে।
সময়ের আলো/কেএইচও