রাজধানীর আফতাবনগরে নকশাভিত্তিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করে প্রথমবারের মতো ই-রিকশার পাইলট কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষ নকশায় তৈরি তিন চাকার এই স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এ অনুষ্ঠানে ঢাকা শহরকে একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর রিকশা চলাচল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তাই ঢাকায় ভবিষ্যতে ভাইরাসের মতো আর রিকশা বাড়তে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তারা বলেন, ই-রিকশা ঢাকার বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে এর কাঠামো, ব্রেকিং, ব্যাটারি নিরাপত্তা এবং আরোহীর সুরক্ষা নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বিকল্প নেই। এই পাইলটিং কর্মসূচির মাধ্যমেই সেই মান যাচাই করা হবে। নতুন নকশার এই ই-রিকশা সাধারণ ই-রিকশার তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে এতে গতি নিয়ন্ত্রিত ও উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাটারি নিরাপত্তা মান যাচাই করেই এটি তৈরি করা হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে বাস্তব সড়কে চালিয়ে রিকশাটির ব্রেক, ব্যাটারির সক্ষমতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, আরোহীর আরাম, কম্পন সহনশীলতা এবং চালকের নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।
শনিবার রাজধানীর আফতাবনগরে নিরাপদ ই-রিকশার পাইলট কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিরক্ষা ও সংহতি উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, রাজধানী শহর ঢাকাকে বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে ফেরাতে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছি। সবাইকে এক টেবিলে এনে কাজ না করলে ঢাকা কখনো নিরাপদ শহর হবে না। ঢাকা শহরকে একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর রিকশা চলাচল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ড্রাইভারদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল নিশ্চিত করতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
উপদেষ্টা বলেন, উন্নতমানের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারের পাশাপাশি জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় রিকশা চালনার শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হবে। এবার বুয়েটের নকশা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ডিজাইন ও উৎপাদন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। আগে মন্ত্রণালয় আর সিটি করপোরেশন আলাদাভাবে কাজ করত। ডান হাত কি করছে, বাম হাত জানত না। এবার আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছি, যাতে সেই বিচ্ছিন্নতা না থাকে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এক ই-রিকশা আমার গাড়ি ঘেঁষে টেনে চলে যায়। নেমে দেখি এক শিশু চালক, প্রশিক্ষণ নেই, ব্রেক খুঁজে পায় না। ডেন্টিং করাতে ২৫ হাজার টাকা লেগেছিল। ৫০০ টাকাও তার জন্য বোঝা হয়ে যেত। তখনই বুঝেছি, সড়ক নিরাপত্তা শুধু আইন বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হবে না, ডিজাইন আর প্রশিক্ষণ দিয়েও করতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, আমরা যাত্রী, পথচারী, গাড়িচালক আর রিকশাচালক সবার জন্য ঢাকা নিরাপদ করতে চাই। পুরোনো সমাধান দিয়ে নতুন সংকট সামলানো যাবে না, তাই নতুন চিন্তা আর প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছি। লক্ষ্য একটাই, ঢাকাকে আবার বাসযোগ্য নগরীতে ফেরানো।
রাজধানী ঢাকায় ভাইরাসের মতো রিকশা আর বাড়তে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, রিকশা আর অবৈধ চার্জিং স্টেশনকে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হবে না। নতুন নকশার রিকশা চলবে নির্দিষ্ট জোনে, নির্দিষ্ট সংখ্যায়, আর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। ডিএমপি প্রতিটি জোন ও ওয়ার্ডভিত্তিক এলাকায় সর্বোচ্চ কত রিকশা চলতে পারবে, সেই সংখ্যা সিটি করপোরেশনকে জানাবে। আমরা সেই হিসাব অনুযায়ী মোট অনুমোদন দেব। অনুমোদনের বাইরে আর কোনো রিকশা নামার সুযোগ থাকবে না। প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে, এটা শতভাগ কার্যকর করা হবে।
পাইলটিংয়ের জোন বণ্টন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আফতাবনগরে আপাতত পুরোনো ই-রিকশা চলবে, আর সাঁতারকুলে নতুন নকশার রিকশা পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করবে। কালকেই নতুন রিকশা পাবেন না, কারণ ফ্যাক্টরিগুলো এখন থেকে উৎপাদন শুরু করবে। বাজারদর অনুযায়ী ধীরে ধীরে শিফটিং হবে, যেন চালক ও মালিক উভয়ের পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
চালকদের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে এজাজ বলেন, ইতিমধ্যে ২৪০ জন চালককে লাইসেন্সিং ও ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। ধানমন্ডি-ঝিগাতলা জোনে নতুন রিকশা চলবে, আর মতিঝিলে পুরোনো রিকশার অনুমতি থাকবে এক বছর, নতুন নকশার রিকশার অনুমোদন পাঁচ বছর পর্যন্ত দেওয়া হবে।
অবৈধ চার্জিং স্টেশন নিয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, চার্জিং স্টেশন বন্ধ করলে অবৈধ রিকশা এমনিতেই থেমে যাবে, তাই কোন চার্জিং স্টেশন বৈধ, কোনটা অবৈধ-সেটা শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। চার্জিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ থাকবে, প্রয়োজনে অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্ক বন্ধের কৌশলও তৈরি করা হচ্ছে। লাইসেন্স, ডিজাইন, গতি নিয়ন্ত্রণ, জোনভিত্তিক সংখ্যা সব মিলিয়ে আমরা একটি কন্ট্রোল মেকানিজম দাঁড় করাচ্ছি। এতদিন কোনো নিয়ম ছিল না, তাই রিকশা ভাইরাসের মতো বেড়েছে। এখন এটা রেগুলেশন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আসবে। পাইলট সফল হলে অন্য জোনেও সম্প্রসারণ করা হবে।
ই-রিকশা কার্যক্রম প্রসঙ্গে ডিএনসিসির মুখপাত্র জোবায়ের হোসেন বলেন, পাইলটিং থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নিরাপত্তা মান সন্তোষজনক প্রমাণিত হলে নগর পরিবহনে ধাপে ধাপে এর সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হবে।