রাজধানী ঢাকায় এখন ভোটের আমেজ। শহরের অলিগলি থেকে চায়ের দোকান কিংবা যেকোনো আড্ডায় প্রাধান্য পাচ্ছে ভোটপূর্ব আলোচনা। যোগ্য প্রতিনিধি বাছাইয়ের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ভোটাররা। বয়স্কদের পাশাপাশি এবার সমানতালে সক্রিয় তরুণ ভোটাররাও।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন এই ভোটারদের ভূমিকাও রয়েছে তুমুল আলোচনায়। এমন বাস্তবতায় ঢাকা-১১ আসনে একজন প্রবীণ প্রার্থীর সঙ্গে একজন নবীন প্রার্থীর লড়াইয়ের আভাস মিলছে। এদের একজন বিএনপির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা ড. এম এ কাইয়ুম। অন্যজন হলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম।
রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা এই তিনটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত আসন ঢাকা-১১। ভোটযুদ্ধে ড. এম এ কাইয়ুম ও নাহিদ ইসলাম ছাড়াও প্রভাব তৈরি করতে পারেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ। এ আসনের ভোটারদের অনেকেই বলছেন, এবার প্রতীকের চেয়ে প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। কারও কারও মনে সুষ্ঠু ভোট নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে কারও কারও মধ্যে চাপা আতঙ্ক থাকলেও এলাকার ভোটারদের প্রত্যাশা, প্রার্থীরা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখবেন এবং প্রশাসন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যাতে ভয়হীন চিত্তে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। স্থানীয় ভোটাররা জানান, বিএনপির প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুম দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক ড. এম এ কাইয়ুম ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই এলাকার কমিশনার ছিলেন।
সেই হিসেবে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক ও আলাদা ইমেজ রয়েছে। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। এলাকার পথঘাট সবই তার পরিচিত। তার সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে সংহত। এ ছাড়া বিএনপির মতো বড় দলের বিশাল সমর্থক ও কর্মীবাহিনী রয়েছে তার সঙ্গে; প্রচারের ক্ষেত্রে যা তাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করলেও গণঅভ্যুত্থানের পর ফের সক্রিয় হয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলাম জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত। শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই তরুণ নেতা নতুন রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের সমর্থন পাচ্ছেন নাহিদ। তরুণ ভোটারদের অনেকেই তাকে সমর্থন দিচ্ছেন, যা তাকে জয়ের ব্যাপারে বাড়তি আশা দেখাচ্ছে। এই লড়াইয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ। রামপুরা, ভাটারা ও আফতাবনগর এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে তার।
২০২০ সালের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৮ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। ফলে এবার তার প্রাপ্ত ভোট মূল দুই প্রার্থীর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
এই আসনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা আওয়ামী লীগের দখল থাকলেও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এই দলটি এবার নির্বাচনে নেই। তবে এলাকায় তাদের কর্মী-সমর্থকরা রয়েছেন। তারা ভোটের মাঠে কোনদিকে ঝুঁকবেন সেটিও ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অনেকে।
ঢাকা-১১ আসনের ভোটার এলাকা : এই আসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকা, রামপুরা থানার টিভি সেন্টার, আফতাবনগর আবাসিক এলাকা, বনশ্রীর একাংশ, মহানগর প্রজেক্ট, মালিবাগ-চৌধুরীপাড়া; ভাটারা থানার নতুন বাজার, বারিধারা সংলগ্ন এলাকা, নুরের চালা ও ছোলমাইদ এলাকা নিয়ে এ আসন। মূলত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২১, ২২, ২৩, ৩৭, ৩৮, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১১ আসন। যার আসন নং ১৮৪।
ভোটার পরিসংখ্যান ও প্রার্থী পরিচিতি : এই আসনে মোট ভোটার রয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন। আর ৩ জন রয়েছেন হিজড়া ভোটার।
প্রার্থী পরিচিতি : এ আসনে প্রার্থী হিসেবে আরও রয়েছেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ (ছড়ি প্রতীক), গণফোরামের মো. আবদুল কাদের (উদীয়মান সূর্য), গণঅধিকার পরিষদ-জিওপির মো. আরিফুর রহমান (ট্রাক প্রতীক), জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ (লাঙ্গল), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি-বিআরপির মো. জাকির হোসেন (হাতি প্রতীক)। এ ছাড়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির মো. মিজানুর রহমান (আম) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি (ফুটবল) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।
সরেজমিন ঢাকা-১১ : সরেজমিন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীদের পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। এই আসনে ভোটার বেশি হওয়ার কারণে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা দিনভর ছুটছেন দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তবে অনেক দিন পর নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ আসায় তারাও ভেবেচিন্তে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। যদিও ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে কারও কারও মধ্যে চাপা আতঙ্ক ও সংশয় থাকলেও এলাকার ভোটারদের প্রত্যাশা, প্রার্থীরা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখবেন এবং প্রশাসন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যাতে ভয়হীন চিত্তে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
আফতাবনগরের বাসিন্দা মুসা আহমেদ বলেন, উৎসবের আমেজের পাশাপাশি ভোটার মনে এক ধরনের আতঙ্কও রয়েছে। ফলে মানুষ ভোটকেন্দ্র যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে ভোটের দিনের পরিস্থিতির ওপর। তবে আমরা আশা করছি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভোটার উপস্থিতিও বাড়বে এবং বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা ও চায়ের দোকানি আব্দুল মান্নান সময়ের আলোকে বলেন, বিগত কয়েক বছরের নির্বাচনে আগে যেমন বিএনপি থাকত না, এখন আওয়ামী লীগ নেই। সব দলের অংশগ্রহণ থাকলে ভোটের আসল আমেজ পাওয়া যেত বলে জানান তিনি।
বিগত বছরগুলোর নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন ভোট কতটা সুষ্ঠু হবে? তৃণমূল বিএনপির অনেকের ধারণা, ড. কাইয়ুমের জয় অনেক সহজ হবে। কারণ বিএনপির প্রার্থী একজন ‘গ্রহণযোগ্য’ জনপ্রতিনিধি ছিলেন। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের সমর্থকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে তরুণদের কাছে নাহিদ ইসলামের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে।
জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী এ প্রসঙ্গে ১১ দলীয় জোটের নেতা নাহিদ ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন আমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। তবে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং নারীদের কাছ থেকে যথেষ্ট ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।
এদিকে নির্বাচিত হলে নিজ আসনের গ্যাস সংকট সমাধান ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন বিএনপির প্রার্থী ড. কাইয়ুম। আমার ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে ঢাকা-১১ আসনে ভোট স্থগিত করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছেও বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি এই প্রার্থী।
সময়ের আলো/এআর