প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৮ এএম
সংগৃহীত ছবিবাংলাদেশে হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, একই সঙ্গে চীন এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করতে চাচ্ছে ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন হবে আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসানের পর দেশের প্রথম জাতীয় ভোট।
একাধিকবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে, যা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। ফলে এই সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততায় এগিয়ে গেছে। এদিকে ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, নতুন বাংলাদেশ গঠনে বহু পথ বাকি আছে বাংলাদেশের। তবে হাসিনার পতনের পর নতুন বাংলাদেশের অর্জনও কম নয় বলে উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনটিতে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, ১৮ কোটি মানুষের মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশ হাসিনা আমলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা খাতে শক্ত সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। তবে ভারতের অবস্থান ছিল ঢাকার প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন সেই সমীকরণ বদলে যাচ্ছে।
বেইজিংয়ে ঝুঁকছে ঢাকা : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ সরকার প্রকৃত অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগর সম্পর্কিত চীনের কৌশলগত চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এই কৌশলে চীনপন্থি ভূমিকা পালন করবে এ ব্যাপারে চীন ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসী।
ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে; যা কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গত জানুয়ারিতে দুই দেশ ভারতের কাছে প্রস্তাবিত একটি উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘অবিরাম বৈরিতা’ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় ৭০ জন সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। ঢাকা বলছে, ভারত ঘটনাগুলো অতিরঞ্জিত করছে। তবে এর মধ্যেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে দুই দেশ মাঝেমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।
জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় আসেন। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে এগিয়ে আছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমবেদনাও জানিয়েছেন। বিএনপি জিতলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন ৬০ বছর বয়সি তারেক। তবে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়, যখন এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ‘হিন্দুত্ববাদী প্রতিবাদের’ কারণে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর জবাবে বাংলাদেশ ভারতের বদলে অন্য দেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে চায়।
‘স্থিতিশীলতা’ই লক্ষ্য : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ দোন্থি মনে করেন, দুই দেশই শেষ পর্যন্ত বাস্তববাদী হবে। তার ভাষায়, দুই পক্ষই জানে যে সম্পর্ক খারাপ রাখার মূল্য অনেক। এদিকে ইসলামাবাদের সঙ্গেও ঢাকার সম্পৃক্ততা বাড়ছে। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় পর জানুয়ারিতে পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করেই। দোন্থি বলেন, নতুন সরকার বিরোধ নয়, স্থিতিশীলতাকেই প্রাধান্য দেবে।
যা বলা হয়েছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে : ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরার কথা। এটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। কয়েক মাস ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে এখন পর্যন্ত সৌভাগ্যবশত সেই আশঙ্কা সত্যি হয়নি।
এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে মূলত দুটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দলের মধ্যে লড়াই। আগের শাসনামলে দুটি দলই নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। একটি হলো জামায়াতে ইসলামী। দলটি বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি। অন্যটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া। বর্তমানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ছেলে তারেক রহমান। এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দৌড়ে বিএনপিকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
হতাশা থাকলেও অর্জন উদযাপনযোগ্য : বাংলাদেশের অভ্যুত্থান সাহসী নতুন এজেন্ডাসহ আরও ভালোভাবে নতুন দলগুলোকে শক্তিশালী করতে পারেনি এ নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে অনেকেই হতাশ। শেখ হাসিনার শাসন ছিল নিন্দনীয়, তবে তার আগের সময়ের রাজনীতিও সুখকর ছিল না। যে ইসলামপন্থিরা এবার বিপুলসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে, তারা যতটা সহনশীলতার কথা বলছে, বাস্তবে তারা তার চেয়ে অনেক কম সহনশীল এমন আশঙ্কা প্রবল। অন্যদিকে বিএনপির আগের শাসনামলগুলো চরম দুর্নীতি ও আরও নানা অনিয়মে কলুষিত ছিল।
তবু দুই বছর আগে বাংলাদেশের করুণ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে এবং অন্তর্বর্তী সরকার শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে এমন বাস্তব আশঙ্কার কথা মনে রাখলে দেশের অগ্রগতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছানো বাংলাদেশের অর্জনগুলো বড় এবং উদযাপনের যোগ্য।
সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড় : এই নির্বাচন বিপ্লবকে নিয়ে যাবে নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ এক পর্যায়ে। প্রচলিত রাজনীতি ফিরে এলে বিদেশি বন্ধুদের সমর্থন কমে যেতে পারে। দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া রাজনীতিকরা পুরোনো খারাপ অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।
আর সংস্কারের প্রতি উদ্দীপনা ধরে রাখতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ এগোতে পারবে। যেই জিতুক না কেন কাজের তালিকা হবে দীর্ঘ। সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয় হলো অর্থনীতি। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু এখন বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। চলতি বছর বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাবে যে তালিকাভুক্ত দেশগুলো বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা ও স্বল্পসুদে ঋণ পেয়ে থাকে।
শিল্প-কারখানাগুলোকে আরও দক্ষ করতে হবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে যা বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ, যেখানে এশিয়াজুড়ে গড় প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির সরকার যেভাবে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে গেছে, তা নিয়ে বাংলাদেশিদের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ভারতীয় কর্মকর্তারা যখন ভুলভাবে বাংলাদেশকে হিন্দুবিদ্বেষে আক্রান্ত দেশ হিসেবে তুলে ধরেন, তখনও অসন্তোষ বাড়ে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও ভারতকে খোঁচা দিতে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়েছে। পরবর্তী সরকারকে এই সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নিতে হবে।
সবশেষ কাজ হলো দেশের ভেতরে রাজনৈতিক নবায়ন। নির্বাচনের দিন এক গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েও মতামত জানতে চাওয়া হবে। এর লক্ষ্য নতুন করে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি কমানো। নাগরিকদের এসব সংস্কারের পক্ষে থাকা উচিত এবং পরবর্তী সরকারের উচিত সেগুলো আইন হিসেবে কার্যকর করা যদিও এড়িয়ে যাওয়ার প্রলোভন থাকবে প্রবল।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেই দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথও খুঁজতে হবে নতুন নেতৃত্বকে। যদিও বিষয়টি কঠিন কারণ শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর দায় দলটি এখনও স্বীকার করেনি। তবু নতুন বাংলাদেশকে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষমার ওপরও দাঁড় করাতে হবে।
বাংলাদেশিরা তাদের বিপ্লব নিয়ে গর্ব করতেই পারেন যে বিপ্লব বিশ্বের অন্য প্রান্তে ‘জেন জি’ আন্দোলনগুলোকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গড়ার কঠিন কাজটি আসলে এখনই শুরু মাত্র।
সময়ের আলো/এআর