প্রকাশ: রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:২৫ এএম
সংগৃহীত ছবিত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রিকুইজিশন করা হচ্ছে। রিকুইজিশনকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যানবাহন মালিকদের মধ্যে।
আইন অনুযায়ী যানবাহন রিকুইজিশন করার নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অভিযোগ আছে। তবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে যানবাহন রিকুইজিশনের বিষয়ে বিধি মেনে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
দেশে জাতীয় নির্বাচনসহ যেকোনো সময়ে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারসহ যেকোনো ধরনের যানবাহন রিকুইজিশন করার প্রয়োজন পড়ে। যথাযথ আাইন মেনে যানবাহন মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এসব যানবাহন রিকুইজিশন করা হয়। তবে বিগত একাধিক নির্বাচনে এসব ক্ষতিপূরণ এমনকি চালকদের খাবার, যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় এবং টোল না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন চালক ও মালিকরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও বাস মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষে এবার রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন রিকুইজিশন করতে হবে। এছাড়া সারা দেশে বাস রিকুইজিশন করতে হবে প্রায় ১০ হাজার। ইতিমধ্যে বাস মালিক সমিতিগুলোর সঙ্গে ট্রাফিক বিভাগের বৈঠকে এই চাহিদার তথ্য জানানো হয়েছে বলে জানা যায়।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মুখপাত্র ও দফতর সম্পাদক জুবায়ের মাসুদ সময়ের আলোকে বলেন, ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে সমিতির নেতৃবৃন্দের বৈঠকে সারা দেশে ১০ হাজার বাসের চাহিদার কথা বলা হয়েছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী ৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে বাস সরবরাহ করা শুরু হয়েছে। ৭ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এসব বাস রিকুইজিশন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাস মালিকদের পুলিশের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে রিকুইজিশনকালীন সময়ে বাসের দৈনিক ব্যাংকের কিস্তি বাবদ ন্যূনতম দুই হাজার টাকা, জ্বালানি ব্যয় এবং চালকদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে যানবাহন রিকুইজিশনকে কেন্দ্র করে মালিক-চালকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস) রিকুইজিশন করা যায় কি না তা নিয়েও সন্দিহান। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আইন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের যানবাহনই রিকুইজিশন করা যায়।
রাজধানীর জুরাইনে লেগুনা চালক আব্দুর রাজ্জাক শনিবার সময়ের আলোকে বলেন, রিকুইজিশনের ভয়ে ইতিমধ্যে লেগুনা চলাচল সীমিত হয়ে গেছে।
তার নিজের একটি লেগুনা রিকুইজিশন করার জন্য কাগজ জব্দ করা হয়েছে জানিয়ে করে তিনি বলেন, ৮ ফেব্রুয়ারি আমাকে যোগাযোগ করার জন্য বলা হয়েছে।
মাইক্রোবাস চালক লুৎফর রহমান বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য মুন্সীগঞ্জে আমার মাইক্রোবাসটি রিকুইজিশন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি রিকুইজিশনের জন্য নিতে পারে। কিন্তু জ্বালানি ও চালকের খাবারসহ নিয়ম মোতাবেক যা দেওয়ার নিয়ম তা দেওয়া উচিত। পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে গাড়ি রিকুইজিশন করার পর চালকের খাবার ও জ্বালানি খরচ কিছুই পাননি তারা। এবার যেন তেমনটা না হয় সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাড়ি রিকুইজিশনের বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানাচ্ছেন গাড়ির মালিকরা। অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করা যায় কি না তা নিয়ে। ‘ট্রাফিক এলার্ট’ নামক একটি গ্রুপে গাড়ি রিকুইজিশনের বিষয়ে নেটিজেনদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।
আজহার উদ্দিন নামে একজন লিখেন, আমার স্কয়ার নোয়া গাড়িটি ট্রাফিক পুলিশ থামিয়ে রিকুইজিশন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার ফোনে সেই যাত্রায় রক্ষা পেলেও পুলিশ আমাকে জানিয়েছে পরবর্তী সময়ে এই গাড়ি রাস্তায় দেখলে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই রিকুইজিশন করা হবে।
তিনি নেটিজেনদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি রিকুইজিশন করা যায় কি না। আজহার উদ্দিনের মতো এরকম অনেকেরই জিজ্ঞাসা, ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করা যাবে কি না।
ফেসবুকের ওই গ্রুপে শাফকাত বিন আহমেদ নামে একজন লিখেন, তিনি কি তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হতে পারবেন, নাকি পুলিশ রিকুইজিশন করবে? শেখ আশিকুর রহমান নামে আরেকজনকেও একই ধরনের প্রশ্ন করতে দেখা যায়।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সময়ের আলোকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িও রিকুইজিশন করার ক্ষমতা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশে বলা আছে।
ঢাকায় চাহিদা প্রায় ৫ হাজার : ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান সম্প্রতি জানিয়েছেন, নির্বাচন উপলক্ষে প্রায় ২৪০০টি বাস, ৩০টি ট্রাক, প্রায় ১১০০টি লেগুনা এবং এক হাজারেরও বেশি মাইক্রোবাস রিকুইজিশন দেওয়া লাগতে পারে। এসব গাড়ি পুলিশসহ মোট ৯টি সংস্থার জন্য রিকুইজিশন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী, আনসার, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং টেলিকম খাতের সংস্থাগুলো রয়েছে।
রিকুইজিশনকৃত গাড়িগুলো তিন থেকে পাঁচ দিনের জন্য রিকুইজিশন করা হতে পারে। কিছু গাড়ি ৯ ফেব্রুয়ারিতেও নেওয়া হতে পারে বলে জানান তিনি।
ডিএমপির অধ্যাদেশে কী আছে : রিকুইজিশনের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ১০৩-ক ধারায় বলা হয়েছে, অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, পুলিশ কমিশনারের লিখিত আদেশ বলে যেকোনো যানবাহন ৭ দিনের বেশি নয় এমন সময়ের জন্য রিকুইজিশন করা যাবে, যদি তা জনস্বার্থে প্রয়োজন পড়ে। আর কোনো যানবাহন রিকুইজিশন করা হলে গাড়ির মালিককে নির্ধারিত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন কী বলছে : অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে যানবাহন রিকুইজিশনের বিষয়ে বিধি মেনে পদক্ষেপ নিতে বলেছে নির্বাচন কমিশন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হার বা ভাড়ার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ঠিক করে মালিককে তা দেওয়ার বিধান অনুসরণের জন্যও বলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ সম্পর্কিত বিধান পুলিশ কমিশনারকে জানানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছেন ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬-এর বিধান অনুযায়ী নির্বাচনে মোবাইল ডিউটি, প্যাট্রোল ডিউটি, স্ট্রাইকিং রিজার্ভ, নির্বাচনি মালামাল পরিবহন ও ফোর্স পরিবহনসহ নানা কাজে যানবাহন রিকুইজিশনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সময়ের আলো/এআর