পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সীমান্তে সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

৩০ নভেম্বর ২০২৫ মধ্যরাত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ধরে নিয়ে যায দুই বাংলাদেশি যুবক

2026-01-05T03:50:19+00:00
2026-01-05T04:22:00+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সীমান্তে সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫০ এএম  আপডেট: ০৫.০১.২০২৬ ৪:২২ এএম
সংগৃহীত ছবি
৩০ নভেম্বর ২০২৫ মধ্যরাত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ধরে নিয়ে যায দুই বাংলাদেশি যুবক ইব্রাহিম রিংকু (২৮) ও মমিন মিয়াকে (২৯)। ধরে নিয়েই তার ক্ষ্যান্ত হয়নি। নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয় পদ্মা নদীতে।

গত বছর বিএসএফের হাতে এ রকম নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ৩৪ জন বাংলাদেশি নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে। তবে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) হিসাব মতে এই সংখ্যা ৩৯। তবে সংখ্যা যাই হোক না কেন, এই দুটি সংখ্যাই বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। মানবাধিকারকমী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভারতীয় সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

সম্প্রতি আসক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে আরও অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৪ জনকে বিএসএফ অপহরণ করে, যাদের মধ্যে মাত্র চারজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তা ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় আরও অন্তত সাতজন বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। সব মিলিয়ে গত বছর ভারত সীমান্তে ৩৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এইচআরএসএস গত বছরের ১০ মার্চ তাদের অন্য এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সীমান্তে ১০ বছরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে কমপক্ষে ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৮২ জন।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটে ২০২০ সালে। ওই বছর ৫১ বাংলাদেশি নিহত হন। আহত হন ২৫ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিহত হন ২০১৫ সালে। ওই বছর ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হন। আহত হন ৫৪ জন। ২০১৯ সালে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪২ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। একই বছর আহত হন ২৫ বাংলাদেশি।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ২৫ জন আহত হন। ২০২৩ সালে নিহত হন ৩০ জন ও আহত হন ৩১ জন; ২০২২ সালে নিহত ২৩ জন ও আহত ৩১ জন; ২০২১ সালে নিহত ১৭ জন ও আহত ১৪ জন; ২০১৮ সালে নিহত হন ১৫ জন ও আহত হন ১২ জন; ২০১৭ সালে নিহত হন ৩০ জন ও আহত হন ৩৭ জন এবং ২০১৬ সালে ২৮ বাংলাদেশি নিহত হন, আহত হন ২৮ জন।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। তিনি সীমান্ত এলাকায় সব সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলোকে মেনে চলার আহ্বান জানান।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বলেছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের নির্বিচারে গুলি করে মারার জন্য ভারতের বাহিনীর যে আনন্দ, তা উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবশ্যই এ বিষয়ে দাঁড়াতে পারে। 

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ব্যবস্থায় ভারতের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশের মামলা করা উচিত। কারণ বাংলাদেশের মানুষ যদি ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে যায়, তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সমর্পণ করবে। দুই দেশের মধ্যে এটি নিয়ে চুক্তিও আছে। নির্বিচারে গুলি করে মারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এ জন্য ভারতকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর মদদে বিএসএফ গুলি করে শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, কৃষক-শ্রমিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হত্যা করেছে। পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এমন নির্বিচারে হত্যার উদাহরণ নেই। ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমকে মদদ দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ভাষা কিন্তু পাল্টে গেছে। 

শেখ হাসিনা এখন ভারতে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে বিএসএফ প্রতিনিয়ত ভারতীয় জনগণকে উত্তেজিত করে সীমান্তে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করছে। আমরা যখন বেড়া তৈরি করতে যাচ্ছি বাধা দিচ্ছে, আমাদের সীমানায় স্থাপনা নির্মাণেও বাধা দিচ্ছে। এক ধরনের উসকানির মধ্যে তারা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডও অব্যাহত রেখেছে।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলেছেন, সীমান্তে আমাদের দেশের মানুষ যখন বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় তখন তা কেবল একটি মৃত্যু নয়, তখন তা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। আমরা কারও সঙ্গে বৈরিতা চাই না কিন্তু বন্ধুত্বের নামে সীমান্তে লাশের মিছিলও মেনে নেব না। বিএসএফকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন সময় এসছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার।

পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত ভারতীয় বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী কিরিটি রায় সময়ের আলোকে বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গড়ে আড়াইশ মানুষ বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারায়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ভারতীয়। আর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাংলাদেশি। তবে বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে নদ-নদী, খাল-বিলে লাশ গুমের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।

বিশিষ্ট এই মানবাধিকার কর্মী আরও বলেন, ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিএসএফ-বিজিবি বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়ে বলা হতো এবং ভারতের পক্ষ থেকেও হত্যা বন্ধে আশ্বাস দেওয়া হলেও তা কমেনি। সে তুলনায় এখন সীমান্ত হত্যা কিছুটা হলেও কমেছে। তিনি বলেন, আগে বাংলাদেশি হত্যা হলে প্রতিবাদ হতো না। কিন্তু এখন প্রতিবাদ হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশি ভালো নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈরী সম্পর্ক সীমান্তসহ সবকিছুতেই প্রভাব ফেলছে এবং এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   সীমান্ত  সর্বোচ্চ  হত্যাকাণ্ড 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: