‘বেলা ১১টায় ভ্যান নিয়া বাহির হইচু। গিলগিল করে ঠান্ডা বাতাস বহচে। এতোডা বেলা হইল তাহাও রোদ নাই। ঠান্ডাতে কাঁপেছু। বাতাসে হাত-পাও জড়ো হয়ে আসেচে। কিন্তু কী করিবেন, খাবা তো নাগিবে’।
সোমবার এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাহানপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ভ্যানচালক মো. আল আমিন মিয়া (৫০)। পঞ্চগড়ে গত কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। কমেছে দিনে ও রাতের তাপমাত্রা। ঘন কুয়াশা আর উত্তরের হিমশীতল বাতাসে হাড় কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে।
শুধু এই ভ্যানচালক আল আমিন নন, দেশের সর্বত্রই বিপাকে পড়েছেন বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষ। টানা কয়েক দিন ধরে দেশজুড়ে চলছে শীতের দাপট। তীব্র ঠান্ডায় শহর-গ্রামে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশায় চারদিক ঢাকা। কুয়াশায় মোড়া রাস্তাঘাট, দৃষ্টি আটকে যায় কয়েক মিটারের মধ্যেই— গত কয়েক দিন ধরে প্রায় সব এলাকার সকালের দৃশ্যটা এমনই। এমনও হয়েছে যে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শীতের কাপড়ে মুড়িয়ে কেউ রাস্তায় হাঁটছে, কিন্তু মনে হচ্ছে নাকে-মুখে যেন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। এমনকি হাড় কাঁপানো শীতে ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশের কোথাও কোথাও সূর্যের দেখা মিলছে না। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে ইরি-বোরো বীজতলা। হাসপাতালে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। মানুষজন রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান ও বাজার এলাকায় খড়কুটো, কাঠ ও পুরোনো টায়ার জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
সোমবার আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দেশের ১২ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বইছে। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। তবে রাজধানীর তাপমাত্রা আজ এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। সোমবার রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সংস্থাটি জানায়, আজ মঙ্গলবার এবং আগামীকাল বুধবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এরপর থেকে আবার তা কমতে শুরু করবে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর বলেন, শৈত্যপ্রবাহের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। তাপমাত্রা কমে গেছে। তবে আগামী দুদিন তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। এরপর থেকে হয়তো তা আবার কমতে শুরু করবে।
যখন কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তখন তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলে। তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে বলা হয় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলে গণ্য করা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
চলতি মাসে দেশে অন্তত পাঁচ দফায় শৈত্যপ্রবাহ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। এর মধ্যে একটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, সারা দেশে শীতের দাপট অব্যাহত রয়েছে। আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে এবং সেই সঙ্গে ঘন কুয়াশার প্রভাবও বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশার কারণে বিমান, নৌ ও সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের আট জেলা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
কুয়াশা ও শীতের এই যৌথ প্রভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পাশাপাশি পরিবহন খাতেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। সেই সঙ্গে মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকার কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। এ ছাড়া সারা দেশে রাত এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
দেশের নদী অববাহিকায় ঘন কুয়াশার কারণে নৌ-চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কুয়াশার ঘনত্ব বাড়ার ফলে অনেক এলাকায় দৃষ্টিসীমা ২০০ মিটারের নিচে নেমে যেতে পারে, যা নৌযান চলাচলে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নৌযানগুলোকে অত্যন্ত সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো ধরনের সংকেত দেখানোর প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
পঞ্চগড়ে হিমশীতল বাতাসে জনজীবনে দুর্ভোগ : গত দুদিন ধরে পঞ্চগড়ে সূর্যের দেখা নেই। ঘন কুয়াশা আর উত্তরের হিমশীতল বাতাসে হাড় কাঁপানো শীত অনুভূত হচ্ছে। তাপমাত্রার পারদ ১৫ থেকে ১৬ এর মধ্যে ওঠানামা করছে। আবহাওয়া অফিস জানায়, সোমবার সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস।
দুদিন ধরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সূর্যের দেখা নেই। দিনভর হালকা কুয়াশার সঙ্গে হিমশীতল বাতাসে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। রাতেও বৃষ্টির মতো টিপটিপ করে কুয়াশা পড়ে। সড়ক-মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। শহরের থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষজন আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। কনকনে শীতে চরম দুর্ভোগ দেখা দেয় খেটে খাওয়ার মানুষের মধ্যে।
জেলা শহরের মিঠাপুকুর এলাকার রিকশাচালক জামাল উদ্দিন বলেন, দুদিন কুয়াশা আর শীতের জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়া যায়নি। সারা দিন সূর্যের দেখা যায়নি। দিনভর হালকা কুয়াশার সঙ্গে বাতাসের কারণে কনকনে ঠান্ডা ছিল।
আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন বলেন, সোমবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।
ঈশ্বরদীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা : পাবনার ঈশ্বরদীতে তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যয় হয়ে পড়েছে। একদিকে নিম্নমুখী তাপমাত্রা অন্যদিকে উত্তরের হিমেল হাওয়া প্রবাহিত হওয়ার কারণে শীত অনুভব হচ্ছে দারুণভাবে। শীত থেকে পরিত্রাণ পেতে শীতবস্ত্র ছাড়া কেউ বের হচ্ছে না বাইরে।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন জানান, কয়েক দিন ধরে ঈশ্বরদীর ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইতে শুরু হয়েছে। সোমবার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে যা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। এই অবস্থা আরও কয়েক দিন থাকতে পারে জানান তিনি।
এদিকে তাপমাত্রা নিম্নমুখী হওয়ায় কারণে অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে কেউ। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, রিকশা, ভ্যান, অটো রিকশাচালকসহ দিনমজুর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ খুব কষ্টে কাজ করছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিজেরা ঘুরে ঘুরে শহর গ্রাম শহরতলিতে বসবাসকৃত নিম্নআয়ের অসহায় দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র কম্বল বিতরণ করছেন। পাবনা সদরসহ ৯টি উপজেলাতে ২৫ হাজার ৪৭৫টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।
হতাশ চাষিরা : পশ্চিম বগুড়ার আদমদীঘিসহ উত্তরাঞ্চলে কনকন করে বাড়ছে শীত। বাড়ছে শীতজনিত নানা রোগব্যাধি। এর থেকে রক্ষা পায়নি গবাদিপশুও। পশু খামারিরা জানান, শীতজনিত কারণে গত এক সপ্তাহে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কমপক্ষে অসুস্থ হয়েছে প্রায় শতাধিক পশু।
সন্ধ্যার পরপরই শহর জনশূন্য হয়ে পড়ছে। দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও মার্কেটের বারন্দায় আশ্রয় নেওয়া ছিন্নমুল ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। শীতের প্রকোপে ক্ষেত মজুররা কাজে যেতে পারছে না। ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশায় রবিশস্য ও ইরি-বোরো বীজতলার ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
বিষেশ করে আলু ক্ষেত ও ইরি-বোরোর চারা নিয়ে কৃষকরা বেশি উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে আলু ক্ষেতে নানা রকমের রোগবালাই দেখা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে উত্তরের অন্যান্য জেলার মতো আদমদীঘি উপজেলার চাষিরাও আগাম জাতের আমন ধান কেটে শুরু করে আলুর চাষ। মৌসুমের শুরুতেই আলু বীজের চরম সংকট দেখা দিলেও চাষিরা বিভিন্ন উপায়ে চড়া দামে বীজ সংগ্রহ করে আলু ক্ষেত তৈরি করে। অল্প দিনের মধ্যেই সবুজে ভরে ওঠে আলু ক্ষেত। চাষিরাও বুক বাঁধে বাম্পার ফলনের আশায়। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ায় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সবুজ আলু ক্ষেতগুলো বিবর্ণ হতে শুরু করায় চাষিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৫০০ হেক্টর বেশি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল গত বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ হাজার টন বেশি। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাতাসে কাহিল জীবন : সিরাজগঞ্জে কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। ঘন কুয়াশা আর বাতাসে কাহিল হয়ে পড়েছে জনজীবন। নিম্ন আয়ের মানুষজন কাজের জন্য বাইরে বের হতে পারছে না। যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। শীতজনিত রোগ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে ক্রমশ ভিড় বাড়ছে। চলনবিল ও চরাঞ্চলের মানুষজন বেশি দুর্ভোগের কবলে পড়েছেন।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার সকালে জেলায় এ বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাঘাবাড়ী আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।
এফআর