সবচেয়ে বড় বিতর্কের মাঝেও মোস্তাফিজুর রহমান যেন নিজের ছন্দেই আছেন। মাঠের বাইরে যত আলোচনা, সমালোচনা আর রাজনৈতিক টানাপড়েনই থাকুক, তার কোনো ছাপ নেই এই বাঁ-হাতি পেসারের আচরণে কিংবা পারফরম্যান্সে। কখনো টিম বাসে সতীর্থদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে চা-বাগানে ঘুরে বেড়ানো, সিলেট স্টেডিয়ামে স্বজনদের ঘুরে দেখানো- সব মিলিয়ে মোস্তাফিজকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেটারদের একজন। বিতর্ক যেন তাকে ছুঁতে ব্যর্থ।
আইপিএল থেকে বাদ পড়া, রাজনৈতিক বিতর্ক, নিরাপত্তা শঙ্কা- চারপাশ যখন অনিশ্চয়তার শব্দে ভরা, তখন মোস্তাফিজুর রহমান যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতে। মাঠের বাইরে যত কথাই হোক, মাঠের ভেতরে বল হাতে নিজের কাজটাই করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ‘কাটার মাস্টার’। কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, কোনো অভিযোগ নয়- শুধু পারফরম্যান্স দিয়েই উত্তর দিচ্ছেন তিনি।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) পরামর্শে আইপিএল শুরুর আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনা বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচনার ঝড় তোলে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল পাঠাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, মানসিকভাবে চাপে পড়বেন মোস্তাফিজ। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা।
চলমান বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের হয়ে দুর্দান্ত ছন্দেই আছেন তিনি। ৪ জানুয়ারি সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে পাঁচ রানের জয়ে নীরব নায়ক ছিলেন মোস্তাফিজ। ডেথ ওভারে তার নিখুঁত বোলিংয়েই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ১৮তম ওভারে মাত্র দুই রান দিয়ে শামীম হোসেনকে ফেরান তিনি। শেষ ওভারে ১০ রান ডিফেন্ড করে নিশ্চিত করেন রংপুরের নাটকীয় জয়।
আইপিএল থেকে বাদ পড়ার মাত্র এক দিন পর এমন পারফরম্যান্স আবারও মনে করিয়ে দেয়, বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে মোস্তাফিজ কতটা অভ্যস্ত। অথচ আর্থিক দিক থেকে বড় ধাক্কাও খেয়েছেন তিনি। আইপিএল নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার হলেও শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তির সুফল পাচ্ছেন না।
তবে এসব কিছুই যেন তার ভাবনায় নেই। রংপুর রাইডার্সের সহকারী কোচ ও সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ম্যাচ শেষে বলেন, ও একদম চিল। বিসিবি, ভারত, বিপিএল বা আইসিসি- এই সব অফ-ফিল্ড আলোচনা নিয়ে ও মোটেও চিন্তিত না। এখন ও শুধু রংপুর রাইডার্সের জন্য খেলায় মন দিচ্ছে। এরপর যেটা আসবে, সেটায় ফোকাস করবে। ও আলাদা লেভেলের মানুষ।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবেও কাজ করা আশরাফুল আরও যোগ করেন, প্রথম দুই ম্যাচে ওর পারফরম্যান্স একটু নিচে ছিল। কিন্তু ঢাকার বিপক্ষে যেভাবে শেষ দুই ওভার করেছে, সেটাই বলে দেয় এই ফরম্যাটে সে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে ও টি-টোয়েন্টির ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন।
জাতীয় দলের সতীর্থ ও ঢাকা ক্যাপিটালসের ক্রিকেটার মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনও একই অভিজ্ঞতার কথা শোনান, ‘রংপুরের সঙ্গে ম্যাচের পর আমরা একসঙ্গে ডিনার করছিলাম। ভেবেছিলাম ও হয়তো হতাশ থাকবে। কিন্তু একদমই না। গান শুনছিল, একদম রিল্যাক্সড- যেমনটা ও সবসময় থাকে।’
বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনও অবাক নন মোস্তাফিজের মানসিক দৃঢ়তায়, ‘আমি তাকে অনেক দিন ধরে চিনি। হাসিমুখে সবকিছু নেওয়াটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনি তাকে কথা বা আবেগ দিয়ে হেডলাইন হতে দেখবেন না।
সব বিতর্ক, চাপ আর অনিশ্চয়তার বাইরে দাঁড়িয়ে মোস্তাফিজুর রহমান আবারও প্রমাণ করছেন- তিনি শব্দে নয়, বল হাতেই কথা বলেন।
সময়ের আলো/এনএ