আটলান্টিক মহাসাগরে একটি তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলা সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজ আটক করতে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, আর জাহাজটি পাহারা দিতে নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে রাশিয়া। এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ। সম্প্রতি মার্কিন কোস্ট গার্ড ক্যারিবীয় সাগরে বেলা ১ নামের জাহাজটি আটকানোর চেষ্টা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ইরানি তেল পরিবহন করছিল। তবে জাহাজটি গতিপথ পরিবর্তন করে।
জাহাজটি বর্তমানে খালি থাকলেও অতীতে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিবহন করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এটি গতকাল মঙ্গলবার স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচল ঠেকাতে ‘নৌ অবরোধ’ দেওয়া হবে। ভেনেজুয়েলা সরকার এ সিদ্ধান্তকে ‘ডাকাতি’ বলে আখ্যা দেয়।
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র আটক করার আগ পর্যন্ত ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার সরকার জাহাজ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে।
গত মাসে ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড ‘বেলা ১’ নামের জাহাজটিতে তল্লাশির চেষ্টা করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ওয়ারেন্টে বলা হয়, জাহাজটি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরানের তেল পরিবহন করেছে। সে সময় জাহাজটি ভেনেজুয়েলার দিকে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে তল্লাশির আগেই নাটকীয়ভাবে পথ বদলায় জাহাজটি।
পাশাপাশি নাম পরিবর্তন করে ‘মারিনেরা’ রাখা হয় এবং গায়ানার পতাকা নামিয়ে রাশিয়ার পতাকা উত্তোলন করা হয় বলে জানা গেছে।
ইউরোপের দিকে জাহাজটির অগ্রযাত্রার সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি সামরিক পরিবহন বিমান ও কয়েকটি হেলিকপ্টার ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া জানিয়েছে, তারা বিষয়টি ‘উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ’ করছে।
গতকাল মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বাহিনী জাহাজটিতে উঠতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার চেয়ে জব্দ করতেই আগ্রহী।’
এদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তারা প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।
তবে খারাপ আবহাওয়া ও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে মঙ্গলবার রাতে স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় জাহাজটিতে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য থেকে কোনও সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হলে ওয়াশিংটনকে আগে লন্ডনকে জানাতে হবে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
জাহাজটির স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার এটি ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থান করছিল। যদিও এ ধরনের তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব।
মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক দিমিত্রিস আমপাতজিদিস বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, জাহাজের নাম বা পতাকা বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা কম। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত জাহাজটির আন্তর্জাতিক নিবন্ধন নম্বর, মালিকানা ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেয়।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ার পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনেই চলাচল করছে। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ একটি জাহাজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো অস্বাভাবিক নজরদারি চালাচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পশ্চিমা দেশগুলো মুক্ত নৌ চলাচলের কথা বললেও বাস্তবে তা মানছে না।
এই সম্ভাব্য সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটছে, যার কয়েক দিন আগেই মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের সেফ হোম থেকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সময়ের আলো/এনএ