গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কোনো রাখঢাক করছেন না। হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, এমনকি কংগ্রেস ব্রিফিং সব জায়গা থেকেই একই বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। আর তা হলো, আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তাই সেটি অর্জনে শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারটিও অস্বীকার করা হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যদিও আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে তাৎক্ষণিক সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা নেই এবং ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য। তবুও হোয়াইট হাউসের বক্তব্য সেই আশ্বাসকে ভোঁতা করে দিয়েছে।
প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লিভিট স্পষ্টই বলেছেন, সেনাবাহিনী ব্যবহার করা কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে থাকা একটি বিকল্প। এই অবস্থান ইউরোপজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়ে একের পর এক ইউরোপীয় দেশ ঘোষণা দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড কোনো পরাশক্তির সম্পত্তি নয়, এটি সেখানকার মানুষেরই দেশ। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন আরও এক ধাপ এগিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো মিত্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে, তবে সেটাই হবে এই জোটের শেষ। তবু ট্রাম্প প্রশাসন পিছু হটছে না।
রাশিয়া ও চীনের প্রভাব, বরফ গলার ফলে নতুন নৌপথ, বিরল খনিজ সম্পদ এবং আর্কটিকে সামরিক আধিপত্য সবকিছু মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে তারা একদিকে কৌশলগত ঘাঁটি, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। তাদের স্বায়ত্তশাসন, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে ইউরোপ ও কানাডাও এককণ্ঠে কথা বলছে।
এই টানাপড়েনের মধ্যেই ট্রাম্পের বক্তব্য ও পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে এক বিপজ্জনক পথে। যেখানে কূটনীতি নয়, শক্তি ও চাপই হয়ে উঠছে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভাষা। গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে এই মরিয়া মনোভাব শুধু ট্রাম্পের উচ্চাকাক্সক্ষাই নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিকেই নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
বিবিসির খবর অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের লক্ষ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাসহ ‘বিভিন্ন বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউস বিবিসিকে জানিয়েছে, ন্যাটোর সদস্য দেশ ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল করাকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার’ হিসেবে দেখছে। আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে ডেনমার্ক যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইউরোপীয় নেতারা একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই হোয়াইট হাউসের এ বক্তব্য সামনে আসে।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প আবারও বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ‘প্রয়োজন’। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট এবং তার দল এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন। আর অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করার বিষয়টি সব সময়ই কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে থাকা একটি বিকল্প। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে বাইরে থেকে হামলার শিকার হলে মিত্রদেশগুলো একে অপরকে সহায়তা করবে এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
মঙ্গলবার ইউরোপের ছয়টি মিত্র দেশ ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও ডেনমার্কের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডই তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিজেদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ইউরোপীয় দেশগুলো বলেছে, এই নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর সব মিত্রকে ‘যৌথভাবে’ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে তারা সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তাসহ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলো সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন ওই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে ‘সম্মানজনক আলোচনার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনা অবশ্যই এই বাস্তবতাকে সম্মান করে হতে হবে যে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। ওই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে মাদক ও অস্ত্র মামলায় বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিযানের একদিন পর ট্রাম্পের একজন সিনিয়র সহযোগীর স্ত্রী ক্যাটি মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন পতাকার রঙে রাঙানো গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র পোস্ট করেন। মানচিত্রটির পাশে লেখা ছিল ‘শিগগির’। সোমবার তার স্বামী স্টিফেন মিলার বলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত- এটিই মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান।
সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়, গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে কি না। জবাবে মিলার বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেউ লড়াই করতে আসবে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্রিনল্যান্ড সরাসরি কিনে নেওয়া অথবা অঞ্চলটির সঙ্গে একটি ‘কম্প্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ (মুক্ত জোট) গঠনের বিকল্পগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় রয়েছে।
এর জবাবে মঙ্গলবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘এমন দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, যা আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের জন্য উপকারী হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর্কটিক অঞ্চলে আমাদের সাধারণ শত্রুরা ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে। এটি এমন একটি উদ্বেগ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং ন্যাটো মিত্ররা সমানভাবে ভাগ করে নেয়।’
অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার ক্যাপিটল হিলে এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তিনি ডেনমার্কের কাছ থেকে দ্বীপটি কিনে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছেন। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক এর আগেই জানিয়েছিল, দ্বীপটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিষয়ে আলোচনা করতে তারা দ্রুত রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বললে ‘কিছু ভুল বোঝাবুঝি’ দূর হবে।
মিসৌরি থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সিনেটর এরিক শ্মিট মঙ্গলবার বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি তারা এখন কেবল আলোচনা করছে। আমার আশা, ইউরোপ বুঝতে পারবে যে একটি শক্তিশালী আমেরিকা ভালো- এটি পশ্চিমা সভ্যতার জন্য মঙ্গলজনক। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গ্রিনল্যান্ড দখলের ধারণা সামনে এনেছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘মূলত এটি একটি বিশাল রিয়েল এস্টেট চুক্তি।’
দ্বীপটিকে ঘিরে রাশিয়া ও চীনের আগ্রহও বাড়ছে। সেখানে অনাবিষ্কৃত বিরল খনিজ সম্পদ রয়েছে এবং বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন বাণিজ্যিক পথের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। গত মার্চে ট্রাম্প বলেন, এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পেতে যুক্তরাষ্ট্র ‘যতদূর যাওয়া প্রয়োজন, ততদূর যাবে।’ গত গ্রীষ্মে কংগ্রেসের এক শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে প্রশ্ন করা হয়, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো পরিকল্পনা পেন্টাগনের আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, তারা ‘যেকোনো পরিস্থিতির (কন্টিনজেন্সি) জন্য পরিকল্পনা রাখেন।’
৫৭ হাজার জনসংখ্যার দেশ গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছে। তবে এর প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনও ডেনমার্কের হাতে রয়েছে। যদিও অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী ডেনমার্ক থেকে চূড়ান্ত স্বাধীনতার পক্ষে, জনমত জরিপ অনুযায়ী তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ঘোরবিরোধী। দ্বীপটিতে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলুলিসাটের বাসিন্দা, ইনুইট সম্প্রদায়ের ২৭ বছর বয়সি মরগান আনগাজু বিবিসিকে বলেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নেতার মুখে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে উপহাস করা এবং আমাদের সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলা যেন আমরা দখল করার মতো কোনো বস্তু; এসব খুবই আতঙ্কের।