ফেলানী হত্যার বিচারের দাবিতে বুধবার গুলশানের ফেলানী অ্যাভিনিউ অভিমুখে এনসিপি ‘আধিপত্যবাদবিরোধী যাত্রা’ নতুনবাজারে থামিয়ে দেয় পুলিশ। ছবি : সময়ের আলোফেলানীর পিতা নূর ইসলাম বলেছেন, আমার মেয়ে ফেলানী ২০১১ সালে মারা গিয়েছিল। আমি তার সঙ্গেই ছিলাম। বিএসএফ পাখির মতো গুলি করে তাকে মেরে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছিল আমার চোখের সামনে। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বারবার বিচার চেয়েছি, কিন্তু পাইনি।
এখন যে সরকারই আসুক, ফেলানী হত্যার বিচার চাই। সীমান্ত হত্যার বন্ধ চাই। ১৫ বছর ধরে কাঁদছি, আর কোনো মা-বাবার যেন এভাবে কাঁদতে না হয়। বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ফেলানী হত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভাটি আয়োজন করে সুশীল ফোরাম।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি। যেখানে নিরীহ বাংলাদেশিরা প্রতিনিয়ত হত্যার শিকার হচ্ছেন। ফেলানী হত্যা তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং বিচার দাবি করি।
সমগ্র বাংলাদেশ এর বিচার চায়। ফেলানী একা নয়। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হত্যার শিকার হয়েছে। সবশেষ হাদি পর্যন্ত, একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তিনি বলেন, একটি প্রতিবেশীকে কেন্দ্র করে বিগত ১৬ বছরের পররাষ্ট্রনীতি ছিল নতজানু ও মেরুদণ্ডহীন। আমরা এমন স্বাধীন-সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি চাই যেখানে চোখে চোখ রেখে, মাথা উঁচু করে কথা বলব। দেশের স্বার্থে দ্বিধাহীন কণ্ঠে দাবি তুলে ধরব।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ভারত থেকে অবৈধভাবে আগতদের আমরা সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে দিই। কিন্তু আমাদের নাগরিকরা সীমান্তে গেলে গুলি করে মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়। এটিই ‘বন্ধু রাষ্ট্রের’ নমুনা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বন্ধু বলে গর্ব করত। কিন্তু তারা বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু ছিল না। ফেলানীর মা-বাবা ১৫ বছর ধরে চোখের পানি ফেলছেন। বিচার পাননি। কারণ বিগত রাজনীতি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক, দেশপ্রেমের নয়। শত্রুকে বন্ধু বলতে হয়েছে।
বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সহ-সভাপতি আলতাব উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমরা ফেলানী হত্যার বিচারের জন্য একত্রিত হয়েছি। ফেলানীর মা-বাবা এখানে উপস্থিত। আমরা তাদের কষ্ট অনুভব করতে পারি এবং প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু সীমান্তে শুধু ফেলানী নয়, অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যার প্রতিবাদ আমরা করে এসেছি, কিন্তু ফলাফল পাইনি।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মাইনউদ্দিন বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতাকর্মীরা যখন দিল্লি-কলকাতায় পালিয়ে গেলেন, বিএসএফ তাদের গুলি করেনি। অথচ নিরীহ ফেলানীকে হত্যা করা হলো। এ থেকে বোঝা যায়, ভারতীয় প্রশাসন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের শত্রু। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৪৬-এর দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, গোমাংসের অজুহাতে মুসলমান হত্যা সবই মুসলিম বিদ্বেষের প্রমাণ।
সাতক্ষীরা উপজেলা জিয়া ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক এ এস এম আব্দুল আউয়াল সালেহ বলেন, বিএসএফের নির্মম গুলিতে ফেলানী নিহত হয় এবং তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আমি মনে করি, সেদিন কাঁটাতারে শুধু ফেলানী ঝুলে ছিল না, ঝুলে ছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। তিনি বলেন, এ দেশ শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশপ্রেমিক খালেদা জিয়ার দেশ। তারা কখনো দেশের স্বার্থে আপস করেননি। বর্তমান ও আগামী সরকারের কাছে বিনীত আবেদন ফেলানী হত্যার বিচার করুন এবং তার পরিবারকে উপযুক্ত পুনর্বাসন দিন।
জাতীয়তাবাদী আদর্শ বাস্তবায়ন পরিষদের সহ-সভাপতি মাসুমা খাতুন মুক্তি বলেন, আমার বাড়ি সাতক্ষীরায়। বর্ডারের কাছে যাওয়াতে আমার বড় চাচাকে মেরে ফেলা হয়েছে। ফেলানীকে হত্যা করা হয়েছিল ২০১১ সালে। আমার চাচাকে বাহাত্তরে। তা হলে দীর্ঘদিন ধরে আমরা নিষ্পেষিত হচ্ছি। ভারত সরকার আমাদের যেভাবে মারছে, এটি বলার বাইরে। এখন আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। চব্বিশের বাচ্চারা যদি খালি হাতে এমন একটা ফ্যাসিস্ট-দালাল সরকারকে যদি হটাতে পারে তা হলে আমরা কেন পারব না? সভা শেষে সুশীল ফোরামের পক্ষ থেকে ফেলানীর মা-বাবার হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়।