ভেনেজুয়েলা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করছে এবং দেশটির বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের হাতেই থাকবে। এমনটাই দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, কারাকাস যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আমাদের যা দরকার, সবই দিচ্ছে’। তিনি আরও বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর রাজনৈতিক তত্ত্বাবধান বজায় রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমরা এটাকে খুব লাভজনকভাবে পুনর্গঠন করব। আমরা তেল ব্যবহার করব, আর তেল নেব।
কতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভেনেজুয়েলার ওপর নজরদারি রাখবে এ প্রশ্নে তার জবাব ছিল, সময়ই বলে দেবে। এক বছরের বেশি হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বলব, তার চেয়েও অনেক বেশি। এই বক্তব্য সামনে আসে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রোদ্রিগেসের মন্তব্যের পরপরই। তিনি আগের দিন বলেছিলেন, নিকোলাস মাদুরোকে সরাতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর ‘একটি দাগ’ ফেলেছে ঠিকই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করা ‘অস্বাভাবিক বা অনিয়মিত কিছু নয়’। তার ভাষ্য- ভেনেজুয়েলা এমন জ্বালানি সম্পর্কের জন্য উন্মুক্ত, যেখানে ‘সব পক্ষই লাভবান হবে’।
নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্পও প্রায় একই সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা তেলের দাম কমাচ্ছি, আর ভেনেজুয়েলাকে টাকা দিচ্ছি, যেটা তাদের ভীষণ দরকার। তবে এক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান ট্রাম্প। প্রশ্নটি ছিল কেন তিনি ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ডেলসি রদ্রিগেজকে নতুন নেতা হিসেবে সমর্থন দিলেন। অথচ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সফল প্রচার চালানো বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন তাকে অচ্ছুৎই রেখেছেন। তিনি এটাও বলেননি, ভেনেজুয়েলায় কবে নির্বাচন হতে পারে। ট্রাম্প জানান, তিনি নিজে রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না তা বলতে চান না, তবে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সবসময়ই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
এদিকে, গতকাল বুধবার মার্কিন বাহিনী নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনেজুয়েলার দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করে। একই সঙ্গে প্রশাসন ঘোষণা দেয়, ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার সব অপরিশোধিত তেলের বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রই পরিচালনা করবে এবং বিশ্ববাজারে দেশটির পেট্রোলিয়াম বিক্রির ওপর নজরদারি রাখবে। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, আমরা ভেনেজুয়েলা থেকে বের হওয়া অপরিশোধিত তেল বাজারজাত করব। আগে যে তেল মজুদ হয়ে আছে, সেটা বিক্রি হবে। এরপর অনির্দিষ্টকাল ধরে উৎপাদিত তেলও আমরা বিশ্ববাজারে বিক্রি করব।
ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভেনেজুয়েলা তেল বিক্রি করতে পারবে শুধু তখনই, যখন তা ওয়াশিংটনের স্বার্থে কাজ করবে। তার কথায়, আমরা জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণে আছি। আমরা তাদের সরকারকে বলেছি, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থে কাজ করলে তেল বিক্রি করতে পারবে, না হলে পারবে না। মঙ্গলবার ট্রাম্প সর্বোচ্চ ৩ বিলিয়ন ডলারের ভেনেজুয়েলান অপরিশোধিত তেলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার একটি চুক্তির কথা জানান। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত, ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য বাজার খুলে দেওয়ার ট্রাম্পের দাবিতে সাড়া দিচ্ছেন। না হলে আরও সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থাকবে বলেই জানা গেছে।
বর্তমান তেল অবরোধের পাশাপাশি মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় যাওয়া-আসা করা একমাত্র তেলই হবে অনুমোদিত পথে, যা মার্কিন আইন ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের ওপর এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্প প্রশাসনকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব খাটানোর সুযোগ দিতে পারে, এমনকি তেলের দাম প্রভাবিত করার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। মাদুরোকে আটকের পর থেকেই ট্রাম্প বলে যাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলাকে ‘চালাবে’। যদিও রদ্রিগেজ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।
মার্কিন সময় বুধবার ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা তাদের তেলচুক্তি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্যই কিনবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, মাত্র জানলাম, আমাদের নতুন তেলচুক্তি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ভেনেজুয়েলা কেবল আমেরিকান তৈরি পণ্যই কিনবে।
আগামীকাল শুক্রবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বড় বড় তেল কোম্পানির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। লক্ষ্য একটাই ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ওই বৈঠকে তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা বিনিয়োগের আগে শক্ত আইনি ও আর্থিক নিশ্চয়তার দাবি তুলবেন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছেÑ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তারা তেল কোম্পানিগুলোকে দ্রুত ভেনেজুয়েলায় ফিরে গিয়ে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের জন্য চাপ দিচ্ছেন, যাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত তেল শিল্পকে আবার দাঁড় করানো যায়।
সময়ের আলো/এনএ