আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রভাব ফেলতে পারছে না অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। অভিযানের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। দ্বিতীয় দফায় চলমান এই অভিযানে উল্লেখযোগ্য কোনো আসামি, থানা থেকে লুণ্ঠিত কোনো অস্ত্র কিংবা জেল পলাতক কোনো বন্দিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী চলছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযান। প্রতিদিন এই অভিযানে গড়ে ৬ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু চিহ্নিত কিংবা আলোচিত কোনো সন্ত্রাসী গ্রেফতার হচ্ছে না এই অভিযানে। উদ্ধার হচ্ছে না ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৩ শতাধিক অস্ত্র। জেল পলাতক ৭ শতাধিক বন্দির মধ্যে একজনকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি ডেভিল হান্ট অভিযানে।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর চারটি থানায় বিশেষ অভিযানে ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় উদ্ধার করা হয় দুই পুরিয়া গাঁজা, তিন পিস ইয়াবা ও একটি চোরাই প্রাইভেট কার। এভাবে প্রতিদিনই পুলিশের বিশেষ অভিযানে শত শত গ্রেফতারের ঘটনা ঘটছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযানে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তা ছাড়া এ অভিযানে ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৫৪১ রাউন্ড গুলি, ৫৬৬ রাউন্ড কার্তুজ, ১৬৫টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি ও বোমা তৈরির উপকরণ ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় মামলা ও ওয়ারেন্টমূলে ১৯ হাজার ২৩৫ জনসহ সর্বমোট ৩৩ হাজার ৮০৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর আগে গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত ২২ দিনে অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারদের মধ্যে বিভিন্ন পদধারী নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমর্থকও রয়েছে।
উদ্ধার হয়েছে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮৮টি দেশীয় অস্ত্র। পরে ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ ধরা হয় কয়েক হাজার জনকে। তবে চিহ্নিত অপরাধীদের ধরা সম্ভব হয়নি। এমনকি গ্রেফতার হওয়া অপরাধী ও মামলার আসামিদের বড় একটি অংশ পরে জামিনে মুক্তি পেলেও পুলিশের কাছে নেই নির্দিষ্ট তথ্য। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ও ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে দুই দফায় চালানো এই অভিযানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২৭ হাজার ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। বিশেষ এই অভিযানের পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্ট ও অভিযোগের মূলে গ্রেফতার করা হয় ৬০ হাজার মানুষকে। সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী এ পর্যন্ত ৫২০ দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৮৭ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে বিশেষ এই অভিযানের মধ্যেও দেশব্যাপী চলছে খুন ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। গত বুধবার ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নারী কারারক্ষী সাথী আক্তার (৩০)। এ সময় ছিনতাইকারীরা তার মুঠোফোন, স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
রাজধানীর কদমতলী এলাকায় শাহাবুদ্দিন (৪০) নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে গত মঙ্গলবার রাতে।
একই দিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় লিংক রোডে যাত্রীবাহী বাসে ছিনতাইয়ের সময় ধারালো ছুরিসহ আল আমিন (৩০) ও বিজয় (৩২) নামে দুই ছিনতাইকারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছেন বাসচালক ও হেলপার।
গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। তিনি ‘চরমপন্থি’ দলের নেতা ছিলেন বলে দাবি পুলিশের।
গত ২৮ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ শহরে প্রকাশ্য দিবালোকে আব্দুর রহমান রিয়াদ (২০) নামে এক কলেজছাত্রকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
অপরারেশন ডেভিল হান্টের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় থানাসহ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে না পারায় নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়েও আছে দুশ্চিন্তা।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সারা দেশের থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়ে যায়। এর মধ্যে এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র। এসব অস্ত্রের মধ্যে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযানে ৫/৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া ২৭টি অস্ত্রেরও কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি। পুরস্কার ঘোষণা করেও উদ্ধার করা যাচ্ছে না এসব অস্ত্র।
অন্যদিকে ৫ আগস্টের পূর্বে দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া ৭১০ বন্দিরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ভয়ংকর হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং আপাতত খুব বেশি তৎপর না হলেও আসন্ন নির্বাচনে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় সারা দেশে ২৩৭টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঢাকা শহরে, ১২৭টি। এসব গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ৩৮২ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি। এসব দলের সঙ্গে জড়িত ৩১৬ জন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, গাজীপুর ও খুলনা মহানগর এলাকায়ও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং চক্র গড়ে উঠছে- যারা খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। জেলা শহরগুলোতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি পথশিশুরাও আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইতিপূর্বে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এসব পথশিশুকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।