স্থবির দেশের মোবাইল বাজার

আদিল সরকার

টানা কর্মসূচি আর আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের মোবাইল ফোনের বাজার। যা অস্থিরতার সঙ্গে তৈরি করছে নানা অনিশ্চয়তাও। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট

2026-01-10T04:32:57+00:00
2026-01-10T04:32:57+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
স্থবির দেশের মোবাইল বাজার
আদিল সরকার
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩২ এএম   (ভিজিট : ৪১৮)
প্রতীকী ছবি
টানা কর্মসূচি আর আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের মোবাইল ফোনের বাজার। যা অস্থিরতার সঙ্গে তৈরি করছে নানা অনিশ্চয়তাও। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) কার্যক্রম চালু নিয়ে সরকার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলমান এ দ্বন্দ্বের শেষ নিয়ে এখনও পাওয়া যায়নি কোনো বার্তা। দুই পক্ষই তাদের সিদ্ধান্তে রয়েছেন শক্ত অবস্থানে। ফলে বর্তমানে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে বন্ধ রয়েছে মোবাইল বিক্রি। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ভোক্তারা।

জানা যায়, গত বছরে মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেয় সরকার। ঘোষণার পর মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) ব্যানারে আন্দোলনে নামে মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। পরে তাদের বেশ কিছু দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এনইআইআর চালুর তারিখ ১৫ দিন পিছিয়ে ১ জানুয়ারি করার ঘোষণা দেওয়া হয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি) থেকে। এতে ফুঁসে ওঠে ব্যবসায়ীরা। পরবর্তী সময়ে এ এনইআইআর চালুর দিন বিটিআরসির ওই ভবনে হামলা চালায় তারা। পরে ঘটনায় পুলিশ আন্দোলনরত ৪৬ জনকে আটক করে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানে আরও মারমুখো হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীরা। এ সময় তারা পুলিশের হাতে আটক ৪৬ ব্যবসায়ীর মুক্তির দাবির সঙ্গে এনইআইআর স্থগিতকরণ ও পুরোনো ফোন আমদানির সুযোগ দেওয়াসহ কয়েকটি দাবিতে হুঁশিয়ারি দেয়; অন্যথায় সারা দেশে মোবাইল ফোনের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে এসব দাবি নিয়ে সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা। এক পর্যায়ে ঘোষণা দিয়ে পরিবার নিয়ে আন্দোলনে নামে।

বর্তমানে আন্দোলনকারীদের ঘোষণা অনুযায়ী রাজধানীর প্রায় সব মোবাইল মার্কেট বন্ধ রয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর থেকেই বন্ধ রয়েছে দোকানগুলো। তবে বেশ কয়েক জায়গায় কয়েক দিন বন্ধের পর খোলা হয় দোকান। পরে সেখানে হামলা চালিয়ে কিংবা চাপ প্রয়োগ করে বন্ধ করতে বাধ্য করে আন্দোলনকারীরা।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন রাজধানীর মোবাইল মার্কেটের জন্য খ্যাত বসুন্ধরা সিটি, হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজা ও ইস্টার্ন প্লাজা এবং সদরঘাট এলাকার গ্রেটওয়াল শপিং সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ইস্টার্ন প্লাজা ও বসুন্ধরা সিটির মোবাইল মার্কেট খোলা রয়েছে। তবে ঘোষণার পর বন্ধ রেখে বুধবার খোলা হয় বসুন্ধরা মার্কেট; কিন্তু বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে আবারও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় মার্কেট কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ইস্টার্ন প্লাজার বেশ কয়েকটি মোবাইলের দোকান সবসময়ই খোলা ছিল, আর কয়েকটি শোরুম বন্ধ ছিল। তবে বন্ধ হওয়া বেশ কয়েকটি শোরুম বৃহস্পতিবার খোলা হয়েছে। কিন্তু কর্মরত বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তারা আশঙ্কায় রয়েছেন, আবার কখন বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে।

এদিকে পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে মোতালেব প্লাজা। মার্কেটটির পঞ্চম তলায় অবস্থিত মোবাইলের সব দোকান ও শোরুম। তবে ওই তলাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফ্লোরটিতে ওঠার শুরু চার তলাতেই এস্কেলেটরে ফিতা দিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে রাখতে দেখা যায়। এ ছাড়া রাজধানীর বৃহৎ মোবাইল বাজার যমুনা ফিউচার পার্কও বেশ কয়েক দিন বন্ধ রাখার পর খোলা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের হামলায় বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে সব মোবাইল দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

চলমান এ আন্দোলনে বেশ বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। দোকানে দোকানে ঘুরে ফিরে আসতে হচ্ছে তাদের। মোতালেব প্লাজায় মোবাইল কিনতে আসা সাইফ ইব্রাহিম নামে এক ক্রেতা জানান, ‘মার্কেটে মোবাইলের সব দোকান বন্ধ থাকবে তা জানতাম না। ছোট ছেলেকে মোবাইল কিনে দেওয়ার জন্য এসেছিলাম; এটি নিতান্তই ভোগান্তি ছাড়া কিছু না।’ এদিকে মোবাইলের সব শোরুম ও দোকান বন্ধ থাকায় ভাটা পড়েছে মার্কেটের মধ্যে থাকা মোবাইল সার্ভিসিং দোকানদাররাও। ভবনটির একাধিক ফ্লোরে থাকা সার্ভিসিং দোকানগুলোতে ভিড় নেই কাস্টমারদের। অবসর সময় কাটাচ্ছেন কোনো কোনো দোকানি। মার্কেটটির দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত আইফোন ল্যাব দোকানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদেরও কাজ কমে গেছে। এমন অবস্থা চললে কাস্টমার একদম কমে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, আন্দোলন না করারও তো উপায় দেখছি না। কারণ কাস্টমাররাই ভুক্তভোগী। তারাই যখন সরকারের নিয়মে মোবাইল কিনতে আসবে তখন দাম বেশি দেখে হতাশ হবে। সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা দরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রিপেয়ার কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের বাড়ি গিয়ে কাজ করে খেতে হবে, যে অবস্থা দেখছি। সব সেক্টরে খাওয়া শেষ এখন এসে মোবাইলের দিকে নজর পড়ছে সরকারের।’

তবে ইস্টার্ন প্লাজার রিয়েলমি শোরুমের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, ‘তারা (মোতালেব প্লাজার ব্যবসায়ী) তো সিন্ডিকেট। সে জন্য সব বন্ধ করে রেখেছে। আমরা দোকান খুলে ব্যবসায় করছি। তবে কাস্টমার খুবই কম, যা আসছে তা-ও ধরতে পারছি না। তবে আমাদেরও নির্দেশনা এলে শোরুম বন্ধ করে ফেলতে হবে। ইতিমধ্যে যমুনা ফিউচার পার্কে দোকান খোলা রাখায় ঝামেলা হয়েছে।’ ওই মার্কেটটির অপপো, ভিভো, টেকনো ও শাওমিসহ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের শোরুম আন্দোলনের কারণে বন্ধ রয়েছে। সুযোগ বুঝে বুধবার ও তার পরদিন কেউ কেউ শোরুম খুলেছেন। তবে রয়েছেন আশঙ্কায়। স্যামসাং শোরুমের এক কর্মকর্তা জানান, আমাদের ফিক্সড কমিশন। তারপরেও এভাবে বন্ধ থাকলে আমরা টার্গেট পূরণ করতে পারি না। আসলে আনঅফিসিয়াল ব্যবসায়ীদেরই সব সমস্যা। একই চিত্র দেখা যায় সদরঘাটের মোবাইল মার্কেট গ্রেটওয়াল শপিং সেন্টারে। কয়েকটি দোকান খোলা থাকলেও খুব একটা ভিড় দেখা যায়নি ক্রেতাদের।

এদিকে বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সে গিয়ে ক্রেতাদের বেশ ভিড় দেখা যায়। এখানকার মোবাইল মার্কেটটি কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও আবার খোলা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই হুট করে শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। ইমারজেন্সি বাঁশি দিতে দেখা যায় নিরাপত্তাকর্মীদের। পরক্ষণেই নেমে পড়ে শোরুমগুলোর শাটার। সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নিচে আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়েছেন। যেকোনো ঝামেলা এড়াতে মোবাইলের সব শোরুম বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

আন্দোলনরত ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এনইআইআর চালু হলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং বাজার কিছু বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, মোবাইল কিনতে হবে বেশি দামে। কিন্তু এনইআইআর চালুর এ সিদ্ধান্তই কার্যকর করা হবে এবং এর পিছু হটা হবে না বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব জানান, আন্দোলনরত ব্যবসায়ীদের সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে। এরপরেও যদি এই দুর্বৃত্তায়নের চক্রটা অব্যাহত থাকে তা হলে বুঝতে হবে যে, ‘অপরাধের লাইসেন্স চায় তারা।’ তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবে অপরাধ, জালিয়াতি ও প্রতারণার চক্রটাকে সচল রাখতে তাদের এই কর্মকাণ্ডগুলোকে এভাবে চালিয়ে দিতে পারি না। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে এবং এ জন্য যা যা করা দরকার আমরা সবকিছুই করব। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একক খাত হিসেবে বৈধ মোবাইল আমদানিতে সর্বোচ্চ শুল্ক কমানো হয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানোকে স্বাগত না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া এনইআইআর নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকদের মনে যে প্রশ্ন ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা অচিরেই কেটে যাবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

এদিকে এনইআইআর ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) নেতারা। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে তারা জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্তে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ও গ্রাহকের তথ্য আরও বেশি নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে এনইআইআর চালুর ফলে বাংলাদেশে আরও কম দামে মোবাইল ফোন উৎপাদনে আগ্রহী হবেন স্থানীয় ও বিদেশি স্মার্টফোন উৎপাদনকারীরা। এ ছাড়া তারা বলেন, এনইআইআর বাস্তবায়ন দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে অবৈধ, নকল ও চুরির মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে অবৈধ আইএমইআই ব্যবহার বন্ধ হলে ফোন ক্লোনিং, প্রতারণা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

এনইআইআরের এ উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন তারা। দেশের মোবাইল বাজারের এমন চিত্রে হতাশার দৃষ্টি ক্রেতাদের। বিদ্যমান পরিস্থিতির দ্রুত সুরহাই যেন কামনা সবার।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: