অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এক মাস পেরোতেই শিশুদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিতে স্পষ্ট বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। কারও কাছে এই পরিবর্তন এসেছে স্বস্তি ও মুক্তির অনুভূতি নিয়ে, আবার কারও জীবনে তেমন কোনো পার্থক্যই তৈরি হয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি কিশোর বয়সের মানসিক অভ্যাস, সামাজিক যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনের ছন্দকেও নতুনভাবে নাড়া দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিডনির ১৪ বছর বয়সি অ্যামির অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি দিক তুলে ধরে। বহু বছর পর সে নিজেকে ‘সত্যিই মুক্ত’ অনুভব করছে। নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিকে অনলাইন আসক্তির টান তীব্র ছিল। ডায়েরিতে সে লিখেছিল, স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করতে না জানলেও অভ্যাসবশত সকালে ঘুম থেকে উঠে অ্যাপটি খুলতে হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। বন্ধুদের ‘স্ট্রিকস’ বজায় রাখার চাপ থেকে মুক্ত হওয়াকে সে স্বস্তির বলে মনে করেছে। একসময় যে স্ন্যাপচ্যাট তার দৈনন্দিন রুটিনের কেন্দ্র ছিল, সেটি না থাকায় সে দৌড়ানো, নিজের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলেছে। অ্যামির ভাষায়, এখন সে ফোন হাতে নেয় মূলত প্রয়োজন হলেই, আর অ্যালগরিদমের টানে সময় হারিয়ে ফেলার অনুভূতিটা অনেকটাই কমে গেছে।
তবে সবার অভিজ্ঞতা এমন নয়। ১৩ বছর বয়সি আহিলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। সে এখনও ইউটিউব ও স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করছে ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে, আর বড় একটা সময় কাটাচ্ছে রোবোলক্স ও ডিসকর্ডের মতো গেমিং প্ল্যাটফর্মে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার বাইরে। তার কথায়, ‘এতে আসলে কিছুই বদলায়নি,’ কারণ তার বেশিরভাগ বন্ধুই এখনও অনলাইনে সক্রিয়। তবে তার মা মাউ একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেন, আহিল আগের চেয়ে বেশি খিটখিটে হয়ে গেছে এবং ভিডিও গেমে সময় বেড়েছে। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকাকালে সে বেশি সামাজিক ছিল, পরিবারের সঙ্গেও বেশি কথা বলত, যদিও তিনি এটি স্বীকার করেন যে এই মেজাজ পরিবর্তন হয়তো কৈশোরের স্বাভাবিক ধাপও হতে পারে।
ভোক্তা মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা অ্যান্থনি এই মিশ্র প্রতিক্রিয়াকে স্বাভাবিক বলেই দেখছেন। তার ব্যাখ্যায়, অনেক কিশোর-কিশোরীর কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল বিনোদন নয়; এটি একঘেয়েমি, মানসিক চাপ ও সামাজিক উদ্বেগ সামাল দেওয়ার একটি পরিচিত উপায়। সেই সুযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে খিটখিটে ভাব বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এটি প্ল্যাটফর্মের অপরিহার্যতার প্রমাণ নয়, বরং একটি পরিচিত ‘কোপিং ম্যাকানিজম’ সরে যাওয়ার ফল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণরা নতুন উপায়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে শেখে। যেমন, বিশ্বস্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে কথা বলা বা অফলাইনের কাজে যুক্ত হওয়া।
১৫ বছর বয়সি লুলুর অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। সে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার চালিয়ে গেলেও স্বীকার করেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আগের মতো অতটা সময় কাটাতে তার আর ইচ্ছে করে না। সে এখন কিছুটা বেশি বই পড়ছে, যদিও বাইরে বের হওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার হার বাড়েনি। লুলু, অ্যামি ও আহিল তিনজনই এখন হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারের ওপর বেশি নির্ভর করছে, কারণ নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার হারানো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার এটিই সহজ পথ।
অ্যান্থনির মতে, সোশ্যাল মিডিয়াকে আকর্ষণীয় করে তোলে এর সামাজিক দিকটাই। একা একা স্ক্রল করার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে একই পোস্ট দেখা, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং আলোচনায় অংশ নেওয়ার মধ্যেই আসল আনন্দ। যখন সমবয়সিদের উপস্থিতি কমে যায়, তখন অনেক প্ল্যাটফর্ম তরুণদের কাছে আকর্ষণ হারাতে শুরু করে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞার আগে বিকল্প অ্যাপ যেমন লেমন৮, ইয়োপ বা কাভারস্টারের ডাউনলোড হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। অ্যান্থনি এটিকে ‘ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ’ হিসেবে দেখেন, যেখানে পরিচিত তৃপ্তি হারালে মানুষ তার বিকল্প খুঁজে নেয়।
মোবাইল অ্যাপ বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান অ্যাপটোপিয়ার অ্যাডাম ব্ল্যাকার জানান, বিকল্প অ্যাপের ডাউনলোডের প্রাথমিক উল্লম্ফন কমে এলেও তা এখনও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তার মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে কিছু শিশু নতুন নিয়ম মেনে নিচ্ছে এবং মোবাইলের বাইরে অন্য কাজে সময় দিচ্ছে। ভিপিএন ব্যবহারের আগ্রহও শুরুতে বাড়লেও পরে তা কমে এসেছে, কারণ অনেক প্ল্যাটফর্ম এখন ভিপিএন শনাক্ত করতে পারে এবং নতুন করে সবকিছু শুরু করা কিশোরদের কাছে ঝামেলার।
গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলো নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ডিজিটাল কালচার লেকচারার মার্ক জনসন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনায় গেমিং জগতে নতুনদের প্রবেশ অনেক বেশি কঠিন। প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতি না থাকলে সেখানে সামাজিক বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। তার পর্যবেক্ষণে, কিছু অভিভাবক সন্তুষ্ট যে তাদের সন্তানরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কম সময় দিচ্ছে, আবার কেউ হতাশ। কারণ এতে বন্ধু বা দূরের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা অ্যামির জীবনে এক অপ্রত্যাশিত দিক থেকেও প্রভাব ফেলেছে। বন্ডি বিচে গুলিবর্ষণের ঘটনার পর সে ডায়েরিতে লিখেছে, টিকটকে কম সময় দেওয়ায় সে স্বস্তি পেয়েছে, কারণ সেখানে থাকলে হয়তো তাকে প্রচুর নেতিবাচক ও বিরক্তিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হতে হতো। তার মতে, স্ন্যাপচ্যাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফোনে নোটিফিকেশন কমেছে, আর সেই এক অ্যাপই আগে তাকে বারবার অন্য অ্যাপে টেনে নিত।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ‘সোশ্যাল মিডিয়া মুক্ত’ শিশুদের অভিজ্ঞতা একরকম নয়। কারও জীবনে এসেছে স্বস্তি, মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুভূতি; কারও ক্ষেত্রে এসেছে খিটখিটে ভাব ও বিকল্প প্ল্যাটফর্মে ঝোঁক। অ্যামির মা ইউকো যেমন বলছেন, এই পরিবর্তন নিষেধাজ্ঞার ফল নাকি বয়োসন্ধির প্রভাব তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ শিশুদের জীবনে ইতিবাচক না নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেই রায় সময়ই দেবে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।