বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কয়েকজন যোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি নীরবে যুদ্ধের নকশা এঁকেছেন—মীর শওকত আলী তাদের মধ্যে অন্যতম। আজ ১১ জানুয়ারি, এই ক্ষণজন্মা বীরের জন্মদিন। বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত এই মুক্তিযোদ্ধা শুধু একজন সেক্টর কমান্ডার নন, তিনি ছিলেন সংগঠক, কৌশলী ও দূরদর্শী এক সেনানায়ক।
বিদ্রোহের প্রথম প্রহর
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত। ঢাকায় যখন গণহত্যা শুরু হয়েছে, তখন চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বাঙালি অফিসারদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। মেজর মীর শওকত আলী সেই আগুনে প্রথম সারির এক যোদ্ধা। ফোনে ঢাকার ভয়াবহ পরিস্থিতির খবর পাওয়ার পর তিনি বুঝেছিলেন—এটা আর কোনো সামরিক সংকট নয়, এটা জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন।
ভারী অস্ত্রহীন, ট্যাংকবিহীন অবস্থায়ও তিনি সিদ্ধান্ত নেন ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে যুদ্ধ সংগঠিত করার। কালুরঘাটে সরে গিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠিত প্রস্তুতি—যেখানে মীর শওকত আলী ছিলেন চিন্তাশীল কৌশলবিদ।
পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিরোধ
বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, মহালছড়ি—পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি যুদ্ধেই ছিল তার পরিকল্পনার ছাপ। ১৬ এপ্রিল ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরের নেতৃত্বে সফল আক্রমণ, চিঙ্গি নদীতে অতর্কিত হামলা কিংবা কুতুবছড়িতে ট্রাক বহরে আঘাত—সবই ছিল সুপরিকল্পিত প্রতিরোধ যুদ্ধের অংশ।
২৭ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণে পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ভারতে গিয়ে সেখান থেকেও যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন—রাতের পর রাত ঘুমহীন থেকে, অপারেশনের পর অপারেশন সাজিয়ে।
৫ নম্বর সেক্টরের রূপকার
মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়, যখন কর্নেল ওসমানীর নির্দেশে মীর শওকত আলী দায়িত্ব নেন ৫ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বিশৃঙ্খল প্রতিরোধকে তিনি রূপ দেন সুসংগঠিত মুক্তিবাহিনীতে।
ডাউকি, শেলা, ভোলাগঞ্জ, বালাট ও বড়ছড়া—এই পাঁচটি সাব-সেক্টরে ভাগ করে তিনি গড়ে তোলেন কার্যকর যুদ্ধব্যবস্থা। গেরিলা আক্রমণ থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ সম্মুখযুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই ছিল তর সুদূরপ্রসারী চিন্তা।
ছাতক থেকে বর্ণি—ইতিহাস গড়ার যুদ্ধ
১৪ থেকে ১৯ অক্টোবরের ঐতিহাসিক ছাতক যুদ্ধ ছিল তার নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। পাঁচ দিনের টানা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে বড় ধাক্কা দেয় মুক্তিবাহিনী। এরপর মৌলভীবাজারের বর্ণি ও গৌরিনগর যুদ্ধ—যেখানে ১২০ মিলিমিটার মর্টার হাতে নিজেই সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন তিনি।
৯ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জে আক্রমণ, ১২ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর বিমান হামলার সমন্বয়, সবশেষে সিলেটে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ। এই বিজয়ের নেপথ্যে ছিলেন মীর শওকত আলীর নিরলস পরিকল্পনা।
যুদ্ধের পরেও দেশের সেবায়
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও তার দায়িত্ব শেষ হয়নি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের কমান্ড, চিফ অব জেনারেল স্টাফ, জিওসি, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮১ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতেও যুক্ত হন, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। তবে পরিচয়ের মূল জায়গা একটাই, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
চিরস্মরণীয় বীর
১৯৩৮ সালের ১১ জানুয়ারি পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে জন্ম নেওয়া এই বীর ২০১০ সালের ২০ নভেম্বর আমাদের ছেড়ে গেলেও তার বীরত্ব আজও জীবন্ত। ইতিহাসের পাতায় তিনি হয়তো সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নন, কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধ বোঝেন—তারা জানেন, মীর শওকত আলী ছিলেন বিজয়ের নীরব স্থপতিদের একজন।
আজ তার জন্মদিনে আমরা স্মরণ করি সেই মানুষটিকে, যিনি যুদ্ধক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র গঠনের ময়দানে জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। মীর শওকত আলী বাংলাদেশ আজও আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নত।
/ইউএমএইচ