প্রকাশ: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩১ এএম (ভিজিট : ১৩২)
সংগৃহীত ছবিমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য তার বিশেষ বাহিনীর কমান্ডারদের একটি সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্রের বরাতে দ্য মেইল অন সান ডে বলছে, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের ‘সাফল্য’ ট্রাম্পকে ঘিরে থাকা কট্টর নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীকে আরও সাহসী করে তুলেছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণ বলছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার এক ভয়ংকর ঐতিহাসিক নজিরকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ : এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চান ট্রাম্প। দ্য মেইল অন সান ডে বলছে, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নকে সামনে আনার সেটাও একটা কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্রেটদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। তবে এমন একটি নাটকীয় পদক্ষেপ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পকে সরাসরি সংঘাতে ফেলবে এবং কার্যত ন্যাটোর ভাঙনের পথ খুলে দেবে।
সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প যৌথ বিশেষ অভিযান কমান্ডকে আগ্রাসনের পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে বলেছেন। কিন্তু জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এই নির্দেশের বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং কংগ্রেসের সমর্থনও পাবে না। একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে তারা কম বিতর্কিত কিছু প্রস্তাব সামনে আনছেন। যেমন রাশিয়ার তথাকথিত ‘ঘোস্ট শিপ’ আটকানো। এগুলো হচ্ছে মস্কোর পরিচালিত শত শত গোপন জাহাজের নেটওয়ার্ক, যেগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলে। অথবা ইরানে হামলার পরিকল্পনার কথাও তোলা হচ্ছে।
কূটনীতিকরা একটি সম্ভাব্য ‘উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি’ নিয়ে যুদ্ধাভ্যাস চালিয়েছেন, যেখানে ট্রাম্প সামরিক শক্তি বা ‘রাজনৈতিক চাপ’ ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেন। একটি কূটনৈতিক বার্তায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, এর পরিণতি হতে পারে ন্যাটোর ভেতর থেকেই ধ্বংস। ওই বার্তায় আরও বলা হয়েছে, কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের আশপাশের কট্টর মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ) গোষ্ঠীর প্রকৃত লক্ষ্যই এটি। যেহেতু কংগ্রেস ট্রাম্পকে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে দেবে না, তাই গ্রিনল্যান্ড দখল ইউরোপীয়দের বাধ্য করতে পারে ন্যাটো ছাড়তে। যদি ট্রাম্প ন্যাটোর অবসান চান, তবে এটাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ পথ।
একটি ‘সমঝোতা পরিস্থিতি’ অনুযায়ী, ডেনমার্ক ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডে এরপর পূর্ণ সামরিক প্রবেশাধিকার দেবে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগেই সেখানে অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, তবে সেটিকে আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছে, ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে ট্রাম্প শুরুতে একটি উত্তেজনামূলক অবস্থান নেবেন, যা পরে সমঝোতায় রূপ নিতে পারে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। তাই গ্রীষ্মের মধ্যেই কোনো পদক্ষেপ আসতে পারে। ৭ জুলাইয়ের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি একটি সমঝোতার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হতে পারে।
স্নায়ুযুদ্ধের অন্ধকার স্মৃতির প্রতিধ্বনি : ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড ‘অপরিহার্য’।
তিনি এমন কথাও বলেছেন যে, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও অঞ্চলটি দখল করা হতে পারে। অথচ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড এবং ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র। ফলে এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি একটি সামরিক জোটসঙ্গীর সঙ্গে সংঘাতের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একপর্যায়ে ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দেন যে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়া আর ন্যাটো টিকিয়ে রাখার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বেছে নিতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের আচরণের সঙ্গে তুলনা টানছে বিশ্লেষকদের। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেরই মিত্র রাষ্ট্রে দুবার সামরিক আগ্রাসন চালায়। ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলো নিয়ে গঠিত ওয়ারশ প্যাক্ট ছিল ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপীয় সমান্তরাল জোট। মস্কো তখন প্রকাশ্যেই দাবি করেছিল, কোনো মিত্র রাষ্ট্র সোভিয়েত নীতির বাইরে গেলে সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
ভিন্নমত বিশেষজ্ঞদের একাংশের : বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত বক্তব্যের সঙ্গে সোভিয়েত আগ্রাসনের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে নয়, বরং জোটের অখণ্ডতা রক্ষার অজুহাতে শক্তি প্রয়োগ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের গবেষক ও সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা চার্লস কাপচানের মতে, ন্যাটো একেবারেই ভিন্ন ধরনের জোট। এটি দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ এবং সদস্যদের মধ্যে গভীর আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কাপচান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর কোনো মিত্র রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে এই ধারণা প্রায় অকল্পনীয়। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেনও স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তা হলে ন্যাটো কার্যত ভেঙে পড়বে। ডেনমার্ক চাইলে ন্যাটোর ধারা ৪ অনুযায়ী জরুরি আলোচনা চাইতে পারে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালায় এবং ডেনমার্ক ধারা ৫ প্রয়োগ করে, তা হলে পুরো জোটকে সামরিক সংঘাতে টেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ট্রাম্প কি সত্যিই সামরিক হস্তক্ষেপ করবেন : তবে কাপচান এই পরিস্থিতিকে এখনও অত্যন্ত দূরবর্তী বলে মনে করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও তা যুদ্ধে গড়ায়নি। একইভাবে ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন নিয়ে ন্যাটোর ভেতরে তীব্র বিরোধিতা থাকলেও সামরিক সংঘাত হয়নি। তার ভাষায়, ‘এই হোয়াইট হাউস নিজেকে অনেকটা রিয়েলিটি টিভির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে।’
তবু ইতিহাসবিদরা সতর্ক করছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জন লুইস গ্যাডিস বলেন, ওয়ারশ প্যাক্টের ভাঙনই ছিল সোভিয়েত ব্যবস্থার অবক্ষয়ের সূচনা। মিত্রদের ওপর জোরজবরদস্তি চালিয়ে সোভিয়েতরা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তার মতে, একটি জোট তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সদস্যরা স্বেচ্ছায় তার অংশ থাকতে চায়।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ অস্বীকার করা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪১ সাল থেকেই সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ভবিষ্যতে অঞ্চলটি চীন বা পুনরুত্থিত রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে গ্যাডিসের মতে, ডেনমার্ক সরকারের সহযোগিতায় ঘাঁটি রক্ষা বা সম্প্রসারণ করাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের একতরফা হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের চেয়ে বেশি ক্ষতি ডেকে আনছে। এটি মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করছে এবং ন্যাটোর ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মিত্রদের ভয় দেখিয়ে কোনো জোট টেকসই হয় না। বরং তাতেই ভাঙনের বীজ রোপিত হয়। গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্য সেই অন্ধকার ইতিহাসের প্রতিধ্বনিই হয়ে উঠছে, যা আজ পশ্চিমা বিশ্বকে গভীরভাবে চিন্তিত করছে।
সময়ের আলো/এআর