প্রকাশ: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫৪ এএম
সংগৃহীত ছবিশীতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে হাজারো রঙের ফুল। ফুলের বর্ণিলমেলা বদলে দিয়েছে সীতাকুণ্ডের শীতকে। রকমারি ফুলের নান্দনিকতা শেষ পৌষে নিয়ে এসেছে উষ্ণতার পরশ। পৌষের শীতে বর্ণিল ফুলমেলায় ম-ম ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে পুরো সীতাকুণ্ড। শহরের কোলাহল ভুলে মানুষ ছুটে আসছে ফুলের এ উৎসবে।
এবারও সীতাকুণ্ড ডিসি হিল পার্কে বসেছে দেশের বৃহত্তম ফুলের উৎসব। চারদিকজুড়ে হাজারো জাতের ফুলের সমাহার, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মিষ্টি ঘ্রাণ, আর মানুষের মুখে মুখে আনন্দের রং।
পার্কের পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর, মাঝখানে জোড়া পুকুর। জোড়া দীঘিতে হাঁসগুলো পা ডুবিয়ে দলবেঁধে ভাসছে। জোড়া পুকুরের মাঝখানে ফুলে ফুলে সাজানো রাস্তা। আর এই রাস্তার পাশে সারি সারি খেজুরগাছ। সেই খেজুরগাছে ঝুলছে মাটির তৈরি কলসি। গাছির লাগানো বাঁশের নল থেকে টপটপ করে মিষ্টি রস পড়ছে সেই কলসিতে। মৌমাছির ওড়াউড়ি সে সঙ্গে মাঝেমধ্যে বাঁশের নলে হালকা চুমুক দিয়ে উড়াল দেয় পাখি।
ফুলমেলায় দীঘির নীলাভ জলরাশিতে সাম্পান ও প্যাডেলচালিত নৌকায় শিশুরা আনন্দে মাতোয়ারা। এর মধ্যেই চারপাশ থেকে ভেসে আসে হাজারো ফুলের সুবাস। পুরো পার্ক হাসছে দেশি-বিদেশি ১৪০ প্রজাতির রঙিন ফুলে। বিভিন্ন ধরনের নকশা ও কারুকাজে গড়ে তোলা এ ফুলের বাগানের মনমাতানো সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
গত ৯ জানুয়ারি শুরু হয়েছে মাসব্যাপী এই ফুলমেলা।
‘চট্টগ্রাম ফুল উৎসব’ নামে এই ফুলমেলার উদ্বোধন করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ।
ফুলমেলা উপলক্ষে ডিসি পার্কে এবার বেশ পরিবর্তন আনা হয়েছে। রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা। জোড়া দীঘির উত্তরে ছনের ছাউনির সারি সারি দোকান চোখে পড়ে। এসব দোকানে পিঠাপুলিসহ নানারকম দেশীয় খাবারের সমাহারে গ্রামীণ মেলা বসিয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
এবার ফুল উৎসবে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বাগানের ওপর দিয়ে জিপলাইনে চড়ার ব্যবস্থাও। এর আগে তিন বছর জোড়া পুকুরের এক পাশে ফুলের বাগান সাজানো হলেও এবার ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিমÑ উভয় পাশই।
দেশি-বিদেশি লাখো ফুলের সমাগম ঘটেছে এবার। শত শত মানুষ সেখানে ফুলকে সঙ্গী করে ছবি তুলতে ব্যস্ত। বাগানে বিদেশি ফুলের মধ্যে আছে লিলিয়াম, ম্যাগনোলিয়া ও ক্যামেলিয়া। আর দেশি ফুল আছে, গাঁধা, জবা, কৃষ্ণচূড়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ দেশ-বিদেশের বাহারি ফুল।
চারদিকে ফুল আর ফুল। মেলার সম্মুখস্থল থেকে পুরো এলাকাতেই ফুল আর ফুল। একদিকে দেখা যায় বড় আকৃতিতে সাজানো চায়ের কেতলি থেকে যেন কাপে ফুল ঝরে পড়ছে। অন্যদিকে প্রজাপতির পাখায় হাজারো ফুল। তা ছাড়া ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে গিটারের আকৃতি, ফুলের ঝুড়ি থেকে ফুল পড়া, হাঁসের আকৃতির গায়ে নানা ফুলের গাছ। মেলায় শোভা পাচ্ছে কবুতরের পাকায় ফুলের আবরণ। এ ছাড়া ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে পুরো মেলাঙ্গন। আছে ছবি তোলার জন্য বিভিন্ন স্থানে সেলফি স্ট্যান্ডও।
ফুলমেলায় রাখা আছে শিশুদের নানা ধরনের রাইডিং। দীঘির দক্ষিণে রয়েছে কিডস জোন, দৃষ্টিনন্দন রেস্তোরাঁ, পানিতে বাঁশের তৈরি ভাসমান সেতু। পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়জুড়েই রয়েছে সাজানো-গোছানো ফুলের বাগান।
আর বিভিন্ন বিনোদন উপকরণ বসানো আছে পার্কের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে। দীঘিতে শতাধিক কায়াকিং ও প্যাডেলচালিত নৌকা রয়েছে। কায়াকিংয়ে অনেককেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। কায়াকিংয়ে প্যাডলার নৌকার ভেতরে বসে পা সামনের দিকে প্রসারিত করে প্যাডেল চালান দর্শনার্থীরা।
দক্ষিণ পাশের পুকুরটির ওপর দিয়ে নেওয়া হয়েছে জিপলাইন। অনেকেই পূর্ব পাশের ফুল উৎসব থেকে পশ্চিম পাশের ফুল উৎসবস্থলে যাওয়া-আসা করছেন। স্মৃতি ধরে রাখতে এবার পেশাদার ফটোগ্রাফারের ব্যবস্থা রাখা হলেও তাদের নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই দর্শনার্থীদের। তারা ব্যস্ত নিজ মোবাইলে ছবি তোলা নিয়ে। শত শত মানুষ সেখানে ফুলকে সঙ্গী করে ছবি তুলতে ব্যস্ত।
ফুল উৎসবে আঞ্চলিক গানের আসরের ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন। যা প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সে সঙ্গে এই পার্কে আলাদা স্টলে আসন্ন গণভোটের প্রচার চালাচ্ছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান কর্নার।
এই উৎসব শুধু ফুল প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, স্মৃতি আর প্রশান্তির ছোঁয়া। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সব বয়সের মানুষ ভিড় জমিয়েছে বাগানের প্রতিটি কোণে। এই উৎসব শেখায় প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানেই নিজেকে ভালোবাসা।
মেলার মাঝে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী দলবদ্ধ হয়ে হাঁটছিলেন। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইতেই তারা এগিয়ে আসেন। সুমাইয়া নুর জানান, তিনি গত তিন বছর ধরেই প্রতিবার এই ফুল উৎসবে আসেন।
তিনি বলেন, তবে এবারের আঙ্গিক অন্যান্যবারের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে। ফুল নরম, নিরীহ, নির্ভেজাল। শুধু সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়।
শীতের বিকাল ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যা নামে তখন লাল সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়ে গোলাপের পাপড়িতে। আর মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে অবাক হয়ে ভাবে কতটা রং থাকতে পারে একটুখানি আলো আর ফুলে! আস্তে আস্তে কুয়াশায় ভিজে যায় পুষ্পরেণু, গাঢ় হয়ে আসের সন্ধ্যার ফুলেরমেলা। মনে পড়ে যায় কোনো প্রিয় মুহূর্ত কিংবা হারিয়ে যাওয়া সময়।
সীতাকুণ্ড ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় ফুল উৎসব এটি। মানুষের চাহিদার কারণে প্রতি বছর নতুন থিম যুক্ত করা হয়। এবার নতুন সংযোজন জিপ লাইনসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে পুরো ডিসি পার্ক। যা পার্কে আগত দর্শনার্থীর মন মুহূর্তেই কেড়ে নেয়। এবারের ফুল উৎসবে ২০ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আমরা আশা করছি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, গতবারের তুলনায় চার প্রজাতির ফুল বাড়িয়ে এবার মোট ১৪০ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুল দিয়ে ডিসি পার্ক সাজানো হয়েছে। উৎসব শুরুর আগে থেকেই এখানে যে হারে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে এটাই আমাদের জন্য আনন্দের। তিনি বলেন, এবারের ফুল উৎসবের দর্শনার্থীরা এক ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, এবারের ফুল উৎসবে ১৫টি দেশের শতাধিক সাংস্কৃতিককর্মীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের শিল্পী ও সাংস্কৃতিককর্মীরা এখানে আসবেন রুটিন করে। চাটগাঁর আঞ্চলিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতি তারা তুলে ধরবেন। এ ফুলমেলা বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সংস্কৃতিরও একটি মেলবন্ধন তৈরি করে দেবে।
সময়ের আলো/এআর