পিঠার উৎসবে শীতের আনন্দ

নিবেদিতা দাস

বাংলার ঘরে ঘরে ফিরে এসেছে পিঠার মৌসুম। কুয়াশাভেজা ভোর, খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর নতুন চালের সুবাসে চারপাশ যেন অন্যরকম

2026-01-13T05:46:25+00:00
2026-01-13T05:46:25+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
পিঠার উৎসবে শীতের আনন্দ
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৪৬ এএম 
প্রতীকী ছবি
বাংলার ঘরে ঘরে ফিরে এসেছে পিঠার মৌসুম। কুয়াশাভেজা ভোর, খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর নতুন চালের সুবাসে চারপাশ যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। শীতের সকালে উঠানের এক কোণে মাটির চুলায় ধোঁয়া উঠছে, পাশে বসে আছেন দাদি। আগের রাতেই ভিজিয়ে রাখা চাল ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পিঠা তৈরির ব্যস্ততা। এই দৃশ্য নতুন নয়— শত শত বছর ধরে বাংলার শীত মানেই এমন এক গল্পের শুরু। পিঠা শুধু খাবার নয়, এটি সময়ের পরতে পরতে জমে থাকা ঐতিহ্য, আবেগ আর পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।

একসময় পিঠা ছিল মূলত গ্রামবাংলার নিজস্ব খাবার। নতুন ধান ঘরে তোলার পর চালের প্রাচুর্য থেকেই পিঠা তৈরির চল শুরু হয়। তখন কোনো পরিমাপের কাপ বা লিখিত রেসিপি ছিল না। অভিজ্ঞ হাত আর চোখের আন্দাজেই দাদি-নানিরা বানাতেন পিঠা। মুখে মুখেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে পিঠা তৈরির কৌশল। সেই ধারাবাহিকতায় পিঠা হয়ে উঠেছে বাঙালির ঘরোয়া গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলার পিঠার বৈচিত্র্য সত্যিই বিস্ময়কর। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, দুধ পুলি, তেল পিঠা কিংবা নকশি পিঠা— প্রতিটি পিঠার স্বাদ, গড়ন আর তৈরির প্রক্রিয়া আলাদা। নতুন চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ, চালের আটা আর খেজুরের গুড় এই সাধারণ উপকরণেই তৈরি হয় অনন্য সব স্বাদের পিঠা। বিশেষ করে খেজুরের গুড় শীতকালীন পিঠাকে এনে দেয় অতুলনীয় স্বাদ ও ঘ্রাণ।

আগে পিঠা তৈরি হতো বাড়ির উঠানে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে। ভোরবেলায় চাল ভেজানো, বাটা, গুড় জ্বাল দেওয়া সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এখনও অনেক গ্রামে সেই ঐতিহ্য টিকে আছে। প্রতিটি পিঠার পেছনে রয়েছে আলাদা গল্প। 

শোনা যায়, ভাপা পিঠা তৈরি হতো মাঠে কাজ করা মানুষের জন্য— সহজে পেটভরে যায় ও গরম থাকে। চিতই পিঠা ছিল অতিথি আপ্যায়নের অনুষঙ্গ। আর পাটিসাপটা যেন সৃজনশীলতার প্রকাশ— পাতলা পিঠার ভেতরে নারকেল-গুড়ের পুর কিংবা দুধে তৈরি ক্ষীর, যত্ন আর ভালোবাসার মিশেল।

পিঠা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেজুর গুড়ের ইতিহাসও। শীত এলেই গাছিরা খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধেন। ভোরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় লালচে গুড়। সেই গুড় ছাড়া শীতের পিঠা কল্পনাই করা যায় না। গুড়ের ঘ্রাণে ভরে ওঠে পুরো বাড়ি— মনে হয় শীত নিজেই বুঝি দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সময় বদলেছে। গ্রাম থেকে শহরে ছুটেছে মানুষ। মাটির চুলার জায়গা নিয়েছে গ্যাসের চুলা, হাঁড়ির বদলে এসেছে ননস্টিক প্যান। তবু পিঠার গল্প থেমে থাকেনি। শহরের পিঠা মেলা, ফুড ফেস্টিভ্যাল, অনলাইন অর্ডার কিংবা ফিউশন পিঠার মাধ্যমে নতুন রূপে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো স্বাদ। চকলেট পাটিসাপটা, চিজ ভাপা পিঠা কিংবা ওভেনে তৈরি পিঠা— ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয়।

স্বাস্থ্য সচেতনতার যুগে পিঠা খাওয়ার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। কম তেল, ভাপে তৈরি পিঠা কিংবা গুড়ের পরিমাণ কমিয়ে খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তবু শীতের সকালে গরম ভাপা পিঠার প্রথম কামড় আজও এনে দেয় এক উষ্ণ অনুভূতি। পিঠা তাই শুধু শীতের খাবার নয়— এটি গল্প, স্মৃতি আর বাঙালির সময়কে ধরে রাখার এক অন্যতম উপায়।

রসে ভেজানো চিতই পিঠা
উপকরণ : আতপ চালের গুঁড়া ১ কাপ, ভাতের চালের গুঁড়া ১ কাপ, খেজুরের রস ২ লিটার, পাটালি গুড় আধা কাপ, লিকুইড দুধ ১ লিটার, নারকেল কোরানো ১ কাপ, দারুচিনি ২ টুকরা, এলাচ ৫টি, তেজপাতা ২টি, কুসুম গরম পানি ১ লিটার, লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালি :
প্রথম ধাপে চালগুলো একসঙ্গে গুঁড়া করে নিন। এরপর চালের গুঁড়া কুসুম গরম পানি ও স্বাদমতো লবণ দিয়ে ব্যাটার বা গোলা বানিয়ে নিন। খেয়াল রাখতে হবে গোলা যেন খুব ঘন বা পাতলা না হয়ে যায়। তারপর গোলাটাকে ৩০ মিনিট ঢেকে রাখুন। চুলায় চিতই পিঠার খোলা বসিয়ে তেল মেখে নিন। খোলা ভালোভাবে গরম হোলে গোলা দিয়ে ৪-৫ মিনিট ঢেকে রাখুন। পিঠা হয়ে গেলে খোলা থেকে পিঠাগুলো তুলে ফেলুন। 

দ্বিতীয় ধাপে একটি পাত্রে খেজুরের রস, পাটালি গুড়, নারকেল কোরানো, দারুচিনি, এলাচ, তেজপাতা একসঙ্গে জ্বাল দিয়ে শিরা করে নিন। অন্য একটি পাত্রে দুধ জ্বাল দিয়ে নিন। শিরা এবং দুধ কিছুটা ঠান্ডা করে একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এরপর পিঠাগুলো দুধের শিরায় ভিজিয়ে রাখুন ৪-৫ ঘণ্টা। তৈরি হয়ে যাবে রসে ভেজানো চিতই পিঠা।

নকশি পিঠা
উপকরণ :
১ কেজি চালের গুঁড়া, ২৫০ গ্রাম গুড়, ১ চিমটি লবণ, পরিমাণমতো তেল (ভাজার জন্য), ১টি খেজুর কাটার (পিঠার নকশা করার জন্য), পরিমাণমতো পানি।

প্রণালি : প্রথমে একটি হাঁড়িতে পরিমাণমতো পানি দিয়ে হালকা গরম হলে এতে স্বাদমতো লবণ ও চালের গুঁড়া দিয়ে ভালো করে নেড়ে নিন। এরপর রুটির ডোর মতো হয়ে এলে ১০ মিনিট অল্প আঁচে ঢেকে রেখে চুলা থেকে নামিয়ে নিন। গুড়ের সঙ্গে পানি দিয়ে চুলায় জ্বাল করে নিন। গুড় আঠালো হয়ে এলে নামিয়ে রাখুন।

পিঠার ডো হাতে ভালো করে মথে নিন এবং মোটা করে লেচি কেটে নিন। এরপর আধা ইঞ্চি পুরু করে রুটি বেলে খেজুর কাটার বা কাঠি দিয়ে পছন্দমতো ডিজাইন করে নিন। এবার কড়াইতে ডুবো তেল দিয়ে একটা একটা করে পিঠার দুই পাশ বাদমি করে ভেজে নিয়ে উঠিয়ে গুড়ে ডুবিয়ে এয়ার টাইট জারে ভরে রেখে দিন। ১ কেজি চালের গুঁড়া দিয়ে ১০-১২টি পিঠা তৈরি হয়ে যাবে।

এই পিঠা দুই থেকে তিন মাস সংরক্ষণ করে উপভোগ করুন।

কাশ্মিরি ভাপা
উপকরণ : চালের গুঁড়া ২ কাপ, গুড় (খেজুর গুড় হলে ভালো) ১ কাপ, কোরানো নারকেল ১ কাপ, দুধ ১ কাপ, এলাচ গুঁড়া আধা চা চামচ, ঘি ২ চা চামচ, কিশমিশ ও বাদামকুচি পরিমাণমতো।

প্রণালি : প্রথমে কোরানো নারকেল ও গুড় হালকা গরম করে মিশিয়ে নিন। চালের গুঁড়া দুধ ও অল্প পানি দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিন। এবার ভাপা পিঠার ছাঁচের নিচে এক স্তর চালের গুঁড়া দিন, তারপর নারকেল গুড়ের পুর, তার ওপরে এলাচ গুঁড়া যোগ করুন। 

ভাপে ১০ থেকে ১২ মিনিট রেখে বের করে ঘি, কিশমিশ ও বাদামকুচি দিয়ে সাজিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

দুধ পুলি
উপকরণ : আতপ চালের গুঁড়া ১ কাপ, পানি ১ কাপ, নারকেল কোরানো ১ কাপ, গুড় ২ কাপ, এলাচ গুঁড়া আধা চা চামচ, লিকুইড দুধ ২ লিটার, লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালি : প্রথম ধাপে একটি পাত্রে পানি গরম করতে দিন। পানি ফুটে উঠলে চালের গুঁড়া ও লবণ দিয়ে নাড়ুন। চুলায় অল্প আঁচে পাত্রটি কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন। ময়ানটা সেদ্ধ হলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। 

দ্বিতীয় ধাপে অন্য একটি পাত্রে ১ কাপ গুড় ও অল্প একটু পানি দিয়ে জ্বাল দিতে হবে। গুড় গলে গেলে নারকেল কোরা দিয়ে নাড়তে হবে। গুড় ও নারকেল কোরা ঘন হয়ে এলে এলাচ গুঁড়া দিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। দুধ পুলির পুর প্রস্তুত। 

তৃতীয় ধাপে সেদ্ধ ঠান্ডা চালের ময়ান ভালো করে মেজে নিন এবং ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। এরপর লেচিগুলোর ভেতরে নারিকেলের পুর দিয়ে পুলি বানিয়ে নিন। পুলির মুখটা ভালোভাবে আটকে দিন। 

চতুর্থ ধাপে দুধ, ১ কাপ গুড় ও এলাচ গুঁড়া একসঙ্গে ফুটিয়ে নিন। পুলিগুলো তার মধ্যে দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রান্না করুন। মাঝেমধ্যে হালকা হাতে নাড়ুন। চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশন করুন দুধ পুলি।

গোলাপ পিঠা
উপকরণ : ২ কাপ ময়দা, ১টি ডিম, ১ চিমটি লবণ, ১ কাপ চিনি, পরিমাণমতো তেল। সিরা তৈরির জন্য ৩ কাপ পানি, দেড় কাপ চিনি, ২ টুকরো দারুচিনি।

প্রণালি : প্রথমে একটি বাটিতে ১টি ডিম ও ১ কাপ চিনি একটু লবণ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। যেন কোনো চিনির দানা না থাকে। এরপর এর সঙ্গে দুই কাপ ময়দা মিশিয়ে ডো তৈরি করে নিন। খেয়াল রাখবেন ডোটি যেন শক্ত বা নরম না হয়। এরপর খামির থেকে লেচি কেটে কয়েকটি রুটি বেলে নিন। এই রুটি কুকি কাটার বা গ্লাসের সাহায্যে ছোট গোল গোল করে কাটুন। তারপর ২টি গোল রুটি একসঙ্গে রেখে চাকু দিয়ে তিন কর্নারে কেটে পরে কাটা টুকরোগুলোকে একটার পাশে আরেকটা উঠিয়ে চেপে গোলাপের মতো পিঠা তৈরি করে নিন। এভাবে সব পিঠা বানিয়ে নিন। তারপর একটি কড়াইতে তেল দিয়ে পিঠাগুলো ডুবো তেলে বাদামি করে ভেজে তুলে ফেলুন। 

সিরা তৈরির উপকরণ চুলায় জ্বাল দিয়ে সিরা তৈরি করে নিন। 

এরপর ভাজা পিঠা তুলে সিরায় দিয়ে ৫ মিনিট রেখে তুলে নিলেই গোলাপ পিঠা তৈরি।

রেসিপি : শাম্মী আক্তার. রন্ধনশিল্পী 

এফআর


  বিষয়:   পিঠার উৎসব  শীতের আনন্দ  ভাপা পিঠা  চিতই পিঠা  পাটিসাপটা  দুধ পুলি  তেল পিঠা  নকশি পিঠা 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: