প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:০৯ এএম
সংগৃহীত ছবিজাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্রের প্রাথমিক বাছাইয়ে ছোটখাটো ভুলও কঠোরভাবে ধরেছে রিটার্নিং কর্মকর্তার। যে কারণে প্রাথমিক বাছাইয়ে ঝুলে যায় ৭২৩ জনের প্রার্থিতা। ফলে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন ৬৪৫ জন সংক্ষুব্ধ প্রার্থী। এদিকে প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়লেও আপিল শুনানিতে ছাড় দিয়ে শিথিলতা দেখাচ্ছে ইসি। যে কারণে গত চার দিনে আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন দুই শতাধিক বা আপিল দায়েরের এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী। বুধবারসহ (১৪ জানুয়ারি) আরও পাঁচ দিন চলবে এ শুনানি। ফলে চূড়ান্ত শুনানি শেষে বাদ পড়াদের বেশিরভাগই ভোটযুদ্ধে ফিরবে বলে ধারণা করছে ইসি কর্মকর্তারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। ইসির প্রাথমিক বাছাই তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগ বাদ গেছে ১ শতাংশ সমর্থন সূচক স্বাক্ষর না থাকায়। এ ছাড়া দ্বৈচয়নের ভিত্তিতে ভোটারকে খুঁজে না পাওয়া, সার্টিফিকেটের কপি দাখিল না করা, রিটার্নের কপি দাখিল না করা, হলফনামায় ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর না থাকা ইত্যাদি।
বাদ পড়া এসব প্রার্থীদের ভোটে অংশগ্রহণে সুযোগ দিতে গত ৫ জানুয়ারি আপিল গ্রহণ শুরু করে ইসি যা ৯ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। এরপর গত ১০ জানুয়ারি থেকে এসব আপিলের শুনানি শুরু করে নির্বাচন কমিশন। এদিন ১ থেকে ৭০ নম্বর আপিলের শুনানি করে ইসি। প্রথম দিনের শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পায় ৫১ জন প্রার্থী, এরপর ১১ জানুয়ারি দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে আবারও ৭০টি আপিলের শুনানি করেছে ইসি। সেখানে প্রার্থিতা ফিরে পায় আরও ৫৮ জন প্রার্থী। ১২ জানুয়ারির শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পায় ৪১ জন এবং গতকাল চতুর্থ দিনের শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছে আরও ৫৩ জন। অর্থাৎ গত চার দিনের আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ২০৩ জন প্রার্থী।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ২৮১ থেকে ৩৫০ নম্বর আপিলের শুনানি করবে ইসি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ৩৫১ থেকে ৪২০ নম্বর আপিলের শুনানি করা হবে। এরপর শুক্রবার ৪২১ থেকে ৪৯০ নম্বর, শনিবার ৪৯১ থেকে ৫৬০ নম্বর ও রোববার শেষ দিনে ৫৬১ থেকে অবশিষ্ট সব আপিলের শুনানি করবে নির্বাচন কমিশন। ইসি জানিয়েছে, শুনানি শেষে ফলাফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। এ ছাড়া নির্বাচন ভবনের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকেও অনুলিপি সংগ্রহ করা যাবে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা মোট ৫৬১টি আপিল আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ২৭৫ জন প্রার্থী আপিল শুনানিতে তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত শুনানির প্রথম দিনে এরপর পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৭
বাছাইয়ে কঠোর আপিলে শিথিল
৫৬ জন, দ্বিতীয় দিনে ৫১ জন, তৃতীয় দিনে ৬১ জন, চতুর্থ দিনে ৪৪ জন, পঞ্চম দিনে ৪৩ জন ষষ্ঠ ও শেষ দিনে ২০ জন প্রার্থী আপিলে তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিল। সে সময় বাছাই পর্বে রিটার্নিং কর্মকর্তারা মোট ৭৩১টি মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন। আপিলে যারা প্রার্থিতা পাননি তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) রিট করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) জাতীয় পার্টির ৫টি আপিল মঞ্জুর করেছে আপিল ট্রাইব্যুনাল। এ নিয়ে চার দিনে মোট ২৬ জন প্রার্থিতা ফিরে পেলেন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আজকে আমাদের পাঁচজন প্রার্থী আপিলে তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছে। এ নিয়ে ২৬ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তিনি বলেন, তুচ্ছ ও কারিগরি ভুলের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়া অযৌক্তিক। এ জন্য অকারণে আপিল করতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আপিল ট্রাইব্যুনাল আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কারিগরি ত্রুটিগুলো সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছে, এটি একটি ইতিবাচক দিক। এর ফলে আরও অনেক প্রার্থী নির্বাচনে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ১২ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টি দেশ স্বাভাবিক ছিল না। ওই সময় ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন ঘটনায় সার্বিকভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। অনেক প্রার্থী স্বাভাবিকভাবে মনোনয়নপত্র প্রস্তুত ও জমা দিতে পারেননি। এমনকি কুয়াশার কারণে লঞ্চ দেরি হওয়ায় একজন প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, অতীতে যেসব ছোটখাটো ভুল রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের সুযোগ দিতেন এবার তা করা হয়নি। বরং টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে ব্যাপক হারে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। শামীম হায়দার পাটোয়ারী আরও বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা ইতিবাচক বিবেচনাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। মূলত মবের ভয় ও ট্যাগিংয়ের কারণে। কেউ আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলেই তাকে ‘দোসর’ আখ্যা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় বাধা।
রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বগুড়া-২ আসনের প্রার্থী ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছিল। তার হলফনামায় বিভিন্ন অসঙ্গতি থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। যার মধ্যে ফৌজদারি মামলার কোনো তথ্য না দেওয়া, যে এফিডেভিট দিয়েছেন তা সম্পাদনের এক দিন পর তার স্বাক্ষর করা এবং সম্পদ বিবরণীর ফরম দাখিল না করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে ট্রাইব্যুন্যলে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পান মান্না। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর মান্নার আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, তুচ্ছ কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ ও স্বাক্ষর যথাযথ না থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো মামলায় অভিযুক্ত হননি। এ ছাড়া স্বাক্ষরের তারিখে গরমিল ছোটখাটো ভুল। তাই তিনি কমিশনে আপিল করেছিলেন। মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ আসনেও প্রার্থী হিসেবে এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক বৈধ হয়েছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোটগ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
সময়ের আলো/এনএ