পুরান ঢাকার আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির মেলা বসে জানান দিয়েছে বিদায় নিতে চলেছে পৌষ। আর পৌষের এই শেষ দিনটিকে পুরান ঢাকার মানুষ উদযাপন করে বহুল পরিচিত সাকরাইন উৎসবের মধ্য দিয়ে। এটি পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব। অনেকেই একে পৌষসংক্রান্তি নামেও চেনেন।
প্রায় এক মাস আগে থেকে সাকরাইন ঘিরে প্রস্তুতি শুরু হয়। বিশেষ করে পুরান ঢাকার দোকানপাটে ঘুড়ি, ফানুস ও নানা উপকরণ তৈরিতে ব্যস্ততা চোখে পড়ে। উৎসবের দিন ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বাসাবাড়ির ছাদে ছাদে শুরু হয়ে যায় ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ। আগের রাত থেকেই চলে সুতায় মাঞ্জা দেওয়া, গান-বাজনার আয়োজন, সঙ্গে থাকে পিঠা-পুলির উৎসব। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানা আয়োজন ও রঙিন অনুষঙ্গে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে সাকরাইন উৎসব।
বুধবার পুরান ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে সাকরাইন উৎসব উপলক্ষে ঘুড়ি ওড়ানো ছাড়াও ছিল নানা আয়োজন। এদিন পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, নারিন্দা, ওয়ারী, সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজার, বংশাল, শিংটোলা, নাজিরা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়ির ছাদে ছাদে প্যান্ডেল করা হয়েছে। সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হচ্ছে। গানের তালে তালে কিশোর-কিশোরী হৈ-হুল্লোড়ও করছেন। দুপুরের পরপরই আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। শুরু হয় নিজের ঘুড়িকে সর্বোচ্চ ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা। সেই সঙ্গে চলে অন্যের ঘুড়ি কাটার লড়াই। সন্ধ্যার পরপর পুরান ঢাকার আকাশ আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে উঠে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি আর আতশবাজিতে।
ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব ঘিরে যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার ঘুড়িসহ অন্যান্য অনুষঙ্গ বেশি বিক্রি হয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। শাঁখারীবাজারের বিক্রেতা শঙ্কর দাস বলেন, চশমাদার, কাউটাদার, পঙ্খিরাজ, প্রজাপতি, চক্ষুদার, ঈগল, সাদা ঘুড়ি, চারবোয়া, দুই বোয়া, টেক্কা, লাভ ঘুড়ি, তিন টেক্কা, মালাদার, দাবা ঘুড়ি, বাদুর, চিল, এংগ্রি বার্ডস ঘুড়ি বেশি বিক্রি হয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা ছিল বড় ঘুড়িতে।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই সাকরাইন উৎসব দেখতে এসেছিলেন ঢাকাসহ বাইরের মানুষও। মিরপুর থেকে পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসব দেখতে আসেন দুই ভাই হাসান ও কবির। তারা দুজন বলেন, ‘পুরান ঢাকাবাসী উৎসবপ্রিয়। প্রতি বছর সাকরাইনে পুরান ঢাকায় ঘুড়ি ওড়ানো হয়। এ দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে। রাতের আতশবাজি ফোটানো দেখতে আরও বেশি ভালো লাগে। প্রতি বছরেই আসি আমরা। সাকরাইন উৎসবকে উপভোগ করতে এসেছি। ফুপির বাসায় এসেছি।
লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা চন্দন কুমার দাস বলেন, ‘সাকরাইন আমাদের পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ছোট বেলা থেকেই এ দিনটা জাঁকজমকভাবে উদযাপন করে আসছি। এবারও আমাদের বাড়ির ছাদে এ আয়োজন করা হয়েছে। বন্ধুরা মিলে ঘুড়ি ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানোর মাধ্যমে অনেক আনন্দ করেছি।’
পুরান ঢাকার মুরগি টোলার সুস্মিতা সেন বলেন, ‘এবার ঘুড়ি উড়িয়ে খুব বেশি আনন্দ পাইনি। তবে আতশবাজি ফুটিয়ে ভালো লাগছে। পরিবারের সবাই মিলে অনেক আনন্দ করেছি।’
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, ‘পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য ঘুড়ি ওড়ানোর আয়োজন করেছিলাম। এখানে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ভবিষ্যতেও এ আয়োজন অব্যাহত থাকবে।’
এদিন দিনব্যাপী ঘুড়ি ওড়ানো শেষে পুরান ঢাকার অলিগলিতে, বাসাবাড়ির ছাদে আয়োজন হয় ডিজে ও নাইট পার্টি। এক দিন আগেই মঞ্চ সাজিয়ে বক্স বাজিয়ে প্রস্তুত ছিল তারা। এ বিষয়ে সবুজ নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এ দিনটিতে আমরা ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি একটু গান গাওয়া আর নাচানাচি করি। বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজনও থাকে।’
সময়ের আলো/কেএইচও