হঠাৎ
ছড়িয়ে পড়া পোস্টাল ব্যালটের দুটি ভিডিও ঝড় তুলেছে নির্বাচনি ডামাডোলে। এ
নিয়ে শক্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। তারা পোস্টাল ব্যালটে প্রার্থীর
নাম ছাপানোর দাবি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, আগামী সংসদ নির্বাচনে
প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন
প্রবাসীরা। শুধু প্রবাসীরাই নন, দেশে ভোটের কাজে যুক্ত থাকা সরকারি
কর্মচারী ও কারাবন্দিরাও ভোট দেবেন পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে। দেশ ও বিদেশ
থেকে এরই মধ্যে ১৫ লাখেরও বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন ‘ভোট বিডি অ্যাপ’র
মাধ্যমে। এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তবে বিপত্তি বেধেছে সামাজিকমাধ্যমে
ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও কেন্দ্র করে।
সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া
প্রায় ৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি পোস্টাল ব্যালট
গুনছেন এবং পাশ থেকে কেউ এর ভিডিও ধারণ করছেন। এ সময় একজনকে ভিডিও করতে
নিষেধ করতেও শোনা যায়। বাধা দিয়ে তিনি বলছেন, এই দাঁড়ান, আপনি ভিডিও করছেন
কেন? এখানে ওনারা মেইন ভিডিও করছেন। কেন আপনারা আরও ভিডিও করছেন? এই ঘটনার
২৭ সেকেন্ডের আরও একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও একটি ঘরে কয়েকজন
মিলে অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনছেন। একটি খামে ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের নাম। ভিডিওটিতে একজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা
যায়, ‘আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে, সব লইয়া যানগা। আমরা দরকার নাই। ভিডিও
কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না। এ ছাড়া একাধিকজন ভিডিও করলে তা ফেসবুকে
ছড়িয়ে যাবে। তখন ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে।’
আরেকজনকে বলতে শোনা যায়,
ভিডিও করলে বাহরাইনে প্রবাসীদের দেওয়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে
পারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওটি বাহরাইনের হিদ এলাকার। ভিডিওটি
সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে
পোস্টাল ব্যালটের স্বচ্ছতা নিয়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন হলে ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি ফল নির্ধারণের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়া ও পোস্টাল ব্যালটে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ভাঁজের মাঝখানে
থাকা নিয়ে আপত্তি তুলে নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএনপি। এর
অগে গত মঙ্গলবার বিকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন,
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী ভোটারদের জন্য বিদেশে যে পোস্টাল ব্যালট
পেপার পাঠানো শুরু হয়েছে, সেখানে কয়েকটি দলের প্রতীক ‘উদ্দেশ্যমূলক’ভাবে
রাখা হয়েছে। প্রতীক রাখার ক্ষেত্রে দলটির প্রতীক এমনভাবে রাখা হয়েছে যাতে
কারও ‘নজরেই’ না আসে। এতে কিছু রাজনৈতিক দলকে বাড়তি ‘সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে
বলে মনে করছে দলটি।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে একটি ‘বিশেষ’ গোষ্ঠী
ব্যালট পেপার নিয়ন্ত্রণ করছে। যার নমুনা আমরা দেখেছি যে বাহরাইনে একটি
বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ব্যালট পেপার হ্যান্ডেল করছে। এটার ভিডিও
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, ভাইরাল হয়ে গেছে।
বাহরাইনে
প্রবাসী এক জামায়াত নেতার বাসায় দুই শতাধিক পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার ভিডিও
ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালট নতুন করে ছাপানোর দাবি জানিয়েছেন
তিনি।
আগামী নির্বাচনে ভোট প্রদানের জন্য ৩০০ সংসদীয় আসনে নিবন্ধন
করেছে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন পোস্টাল ভোটার। এর মধ্যে রয়েছেন- প্রবাস থেকে
৭ লাখ ৬০ হাজার ও দেশ থেকে পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় এক লাখ ৬০
হাজার নির্বাচনি কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার-ভিডিপির সদস্য এবং ৬ হাজারেরও
কিছু বেশি কারাবন্দি। এবার শতাধিক আসনে গড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশিসংখ্যক ভোটার
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। আর এই ভোটাররাই যেকোনো
প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের নিয়ামক হতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন
বিশেষজ্ঞরা।
পোস্টাল ব্যালটে প্রার্থীর নাম চায় বিএনপি : অন্যদিকে
দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনকারী ভোটারদের ব্যালট পেপারে প্রার্থীর
নাম ছাপানোর দাবি জানিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে প্রধান
নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ তথ্য
জানান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন,
কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় হয়েছে, তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। একটা
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজকে আপনাদের বলা উচিত। তা হলো পোস্টাল ব্যালট দেশের
অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হবে। সে জন্য আমরা বলেছি, যে সমস্ত
নির্বাচনি এলাকায় যে কয়জন প্রার্থী থাকে তাদেরই তো মার্কা দিয়ে নাম দিয়ে
ব্যালট হয়। সেই একই ব্যালট যেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার পোস্টাল ব্যালট
হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ বিষয়ে আমরা সুস্পষ্টভাবে আমাদের প্রস্তাব দিয়েছি।
আশা করি সেটা তারা গ্রহণ করবেন। যেহেতু এটা যৌক্তিক। তারা বিবেচনা করার
আশ্বাস দিয়েছেন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক
দলের পক্ষে হয়ে এখানে কিছু কিছু কাজ হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। সেটা প্রকাশিত
হয়েছে। আসলে আমাদের ধারণাও না সেটা প্রমাণিত হচ্ছে। এখন আমরা বলেছি, এ
বিষয়ে আপনাদের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই প্রবাসীদের কাছে যেসব ব্যালট
পাঠানো হয়েছে, কীভাবে পাঠানো হয়েছে, তারা কীভাবে ভোট দেবে, ওখানে কীভাবে
স্ক্যান করবে, আর এক জায়গায় যদি ২০০, ৩০০ ব্যালট পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী
ব্যাখ্যা দেবেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে, এসব বিষয় আমরা
প্রশ্ন করেছি। তারা তাদের ব্যাখ্যাটা দেবে, আমার মনে হয় আজকেও দিতে পারে
কালকেও দিতে পারে বা তাদের সময় মতো দেবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা
সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ ধরনের
ঘটনা উদ্বেগজনক। ভাইরাল ভিডিওটি সত্যি হলে ভোটে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে
আসবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কোনো
আসনে পোস্টাল ভোট বেশি হলে তা প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনব্যবস্থা
সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম বলেন, শুরুতেই এমন হলে পোস্টাল ব্যালটের
পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে
অনাগ্রহী হতে পারে। তাই কোথায় ভুল হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করে নির্বাচন
কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সময়ের আলো/এসকে/