বাহামার
এলিউথেরা দ্বীপের এক নির্জন প্রান্ত। সেখানে চুনাপাথরের নিচে লুকিয়ে থাকা
নোনাজলে যেন নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে এক রহস্যময় সাম্রাজ্য। এখানে জলঘোড়া নামের
মাছের বসবাস অবিশ্বাস্য ঘনত্বে। সমুদ্রের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক, ভঙ্গুর ও
দুর্লভ প্রাণীগুলোর একটি এই জলঘোড়া মাছ। সুইটিংস পন্ড নামের এই স্থলবেষ্টিত
লবণাক্ত জলাশয় বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিয়েছে জলঘোড়াদের গোপন জীবনযাপনের
এক অনন্য জানালা। এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রজাতি সম্পর্কে নতুন তথ্যই
দিচ্ছে না, বরং প্রকৃতি কীভাবে নিভৃতে বিবর্তনের পথ তৈরি করে, তারও এক
জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে।
জলঘোড়া খোঁজার দীর্ঘ অপেক্ষা : জলঘোড়া নিয়ে
গবেষণা মানেই ধৈর্যের পরীক্ষা। কয়েক ইঞ্চি লম্বা আকৃতির এই মাছগুলো রং
বদলাতে পারে গিরগিটির মতো, চলাফেরা করে ধীরগতিতে, আর নিজেদের এমনভাবে
পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে যে চোখে পড়াই মুশকিল। সাধারণত তারা থাকে
সামুদ্রিক ঘাস, ম্যানগ্রোভ বন কিংবা প্রবালপ্রাচীরে, যেখানে শিকারি থেকে
বাঁচতে লুকিয়ে থাকাই তাদের প্রধান কৌশল। ট্যাম্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের
সামুদ্রিক পরিবেশবিদ হিদার মেসন তিন দশকের বেশি সময় ধরে জলঘোড়া নিয়ে কাজ
করছেন। বহু গবেষণা অভিযানে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটিয়েও কখনো কখনো একটি বা
দুটি জলঘোড়া দেখাই সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল।
সুইটিংস পন্ডে জীবন বদলে
দেওয়া মুহূর্ত : ২০১৩ সালে প্রথমবার সুইটিংস পন্ডে স্নরকেলিং (পানির ওপর
ভেসে থেকে মুখে নল লাগিয়ে পানির নিচের দৃশ্য দেখার এক ধরনের পদ্ধতি) করতে
নেমে মেসন যেন এক ভিন্ন জগতে ঢুকে পড়েন। মাত্র এক সপ্তাহান্তেই তিনি ১৬টি
জলঘোড়ার সন্ধান পান, যা বাহামার উপকূলে বহু সপ্তাহের পরিশ্রমেও দেখা যায়
না। তখনই তার মনে হলো, প্রায় এক মাইল দীর্ঘ এই সমুদ্রঘেঁষা অগভীর লবণাক্ত
জলাশয় কোনো সাধারণ জলাশয় নয়। ‘বন্য পরিবেশে জলঘোড়া খোঁজেন এমন কারও জন্য
এটা জীবন বদলে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা’, বলেন মেসন। এখানেই তিনি প্রথম বুঝতে
পারেন, এই জায়গাটি জলঘোড়াদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়।
হাজার বছরের
পুরোনো প্রাকৃতিক দুর্গ : বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় সাত থেকে দশ হাজার বছর
আগে পাশের হ্যাচেট বে থেকে সমুদ্রের পানি চুনাপাথরের ভেতরের ফাটল আর গুহা
দিয়ে ঢুকে সুইটিংস পন্ড তৈরি হয়। স্থলবেষ্টিত এই লবণাক্ত জলাশয়টি ধীরে ধীরে
এক প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত হয়েছে। এখানে বাস করে ব্রিটল স্টার, স্পাইডার
ক্র্যাব, অক্টোপাস, জৈব আলোকোজ্জ্বল প্ল্যাঙ্কটন আর জলঘোড়া। কিন্তু টুনা,
হাঙর, স্কেট বা রে মাছের মতো বড় শিকারিরা এখানে ঢুকতেই পারে না। মেসনের
ভাষায়, ‘এটা যেন দ্বীপের ভেতর আরেকটা দ্বীপ।’
বিবর্তনের পথে আলাদা
এক জনগোষ্ঠী : সুইটিংস পন্ডের জলঘোড়ারা দেখতে অন্যরকম। লম্বা থুতনি, কিছুটা
চাপা দেহ আর তুলনামূলক ছোট লেজ, সব মিলিয়ে তারা সাধারণ জলঘোড়া হলেও ধীরে
ধীরে আলাদা এক উপপ্রজাতির দিকে এগোচ্ছে। বিবর্তনবিদ এমিলি রোজের সঙ্গে কাজ
করে মেসন মনে করেন, এত ঘনত্বে, এত দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস
করা এই জলঘোড়ারা ‘বিবর্তনকে চোখের সামনে দেখার’ বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে।
অন্ধকারে
সবচেয়ে বড় আবিষ্কার : সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারটি আসে রাতে। বাহামাস
ন্যাশনাল ট্রাস্টের উদ্ভিদবিদ ইথান ফ্রেইড স্থানীয়দের কাছ থেকে জলঘোড়ার
গল্প শুনে মেসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথম সফরের পর ফ্রেইড একটি প্রশ্ন
তোলেন- রাতে যদি জলে নামা হয়? তারার আলোয় স্কুবা গিয়ার আর ডাইভ লাইট নিয়ে
পানিতে নেমে তারা যা দেখলেন, তা অবিশ্বাস্য। ‘মনে হচ্ছিল, রাস্তার
রিফ্লেক্টর জ্বলে উঠেছে’, বলেন মেসন। চারদিকে আলোয় ঝিলমিল করা জলঘোড়া।
সময়ের আলো/এসকে/