নাগরিকদের বৈষম্য হ্রাসে জাতীয় কর্মসূচি প্রস্তাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে তাদের সামাজিক উত্তরণ, বৈষম্য হ্রাস ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের লক্ষ্যে আগামী সরকারের জন্য

2026-01-16T03:06:43+00:00
2026-01-16T03:06:43+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
নাগরিকদের বৈষম্য হ্রাসে জাতীয় কর্মসূচি প্রস্তাবনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৬ এএম 
সংগৃহীত ছবি
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে তাদের সামাজিক উত্তরণ, বৈষম্য হ্রাস ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের লক্ষ্যে আগামী সরকারের জন্য জাতীয় কর্মসূচি প্রস্তাবনা করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। যা বিদ্যালয়ের শিশু, শ্রমবাজারে প্রবেশরত যুব, অসুস্থ বয়স্ক, গ্রামীণ কৃষক, শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী ও পেশাজীবী, দারিদ্র্যপীড়িত ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, কর্মজীবী নারী এবং উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে করা এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ১০টি জাতীয় কর্মসূচি হলো- সর্বজনীন ন্যূনতম আয়, সরকারি বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল, যুব ক্রেডিট কার্ড, জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক স্মার্ট কার্ড, জাতীয় শ্রমবাজার তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম, কর্মজীবী নারীদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, নগরাঞ্চলে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা ও জাতীয় সমন্বিত তথ্যভান্ডার। এ ছাড়া দেশের আয় বাড়তে ভূমিকা রাখা আরেকটি কর্মসূচি হলো- সমিন্বত কর ব্যবস্থা, এর মাধ্যমে ভুয়া ভোটার কমে যাবে ও পাসপোর্ট কার্যক্রম সহজ হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। এদিকে এসব কার্যক্রমে মোট জিডিপির ২ শতাংশ খরচ হবে, যার সময়কাল ১-২ বছর থেকে চলমান বলেও জানানো হয়।

এ ছাড়া আগামী সরকারের জন্য নাগরিক ইশতেহার-২০২৬-এ ১২টি নীতি সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এসব নীতি সুপারিশ প্রণয়ন কাঠামোর বাস্তবায়ন শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়- মানসম্মত ও হালনাগাদকৃত তথ্য-উপাত্ত এবং এগুলোর সহজ প্রাপ্যতা; জবাবদিহিতার সংস্কৃতি, সংসদীয় নজরদারি ও নাগরিক সচেতনতা; সমন্বিত পরিকল্পনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও লক্ষ্য নির্দিষ্ট অর্থায়ন; শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আন্তরিকতা। এদিকে তাদের দেওয়া নীতি বিবৃতিগুলো হলো- কার্যকর ও সুশাসনভিত্তিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা; দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার পরিস্থিতির আলোকে যুবদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি; কৃষির বৈচিত্র্যমুখী ও উৎপাদনশীল রূপান্তর; গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চিতকরণ; গুণগত স্বাস্থ্যসেবায় সর্বজনীন অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণে সেবাগ্রহীতার ব্যয় হ্রাস; সবার জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানির নিশ্চয়তা; পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দক্ষ ও সহজলভ্য সরকারি পরিষেবা; সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ; জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানিক অভিঘাত মোকাবিলা; জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও বৈষম্য নির্মূলীকরণে আইনি সুরক্ষা; জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা; সক্রিয় নাগরিকতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা।

এসব নীতি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে সংগঠনটি অবকাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে তথ্যভান্ডারের আন্তঃসংযোগ, ডিজিটাল রূপান্তর, দুর্নীতি নিরসন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্যের নিরাপত্তা, সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ এবং পর্যালোচনা ও নিরীক্ষার কথা তুলে ধরেন। জানা যায়, কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে তাদের কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রস্তাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় কর্মসূচি। এর আওতায় প্রতি পরিবার মাসে ৪ হাজার ৫৪০ টাকা নগদ সহায়তা পাবে। তিন ধাপে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যার চূড়ান্ত পর্যায়ে ১ কোটি ৪৭ লাখ পরিবার এর আওতায় আসবে। প্রথম ধাপে ৩৬ জেলায় বাস্তবায়নে বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

শিক্ষা খাতে বৈষম্য কমানো ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এক বেলা পুষ্টিকর খাবার পাবে। এতে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা ব্যক্ত করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড চালুর। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে। প্রথম ধাপে ৬১ লাখ বয়স্ক ভাতাভোগীর পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা।

একই সঙ্গে যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে যুব ক্রেডিট কার্ড। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুদ ও জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে প্রতি বছর এক লাখ যুবক-যুবতী এই সুবিধা পাবেন। কৃষি খাতে প্রস্তাবিত স্মার্ট কৃষি কার্ড বাংলাদেশ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষি পরিবার চাহিদাভিত্তিক কৃষি প্রণোদনা ও ডিজিটাল সম্প্রসারণ সেবা পাবে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে ও বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে জাতীয় শ্রমবাজার তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ শ্রমশক্তিকে লক্ষ্য করে তৈরি হবে। এ ছাড়া নগরজীবনের ভোগান্তি কমাতে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্র‍্যাঞ্চাইজভিত্তিক সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে বাসচালক ও সহকারীরা হবেন বেতনভুক্ত কর্মচারী। রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে সমন্বিত কর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট এবং দ্রুত কর ফেরত নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি নাগরিক সেবার ভিত্তি হিসেবে একটি জাতীয় সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে সব নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আন্তঃসংযুক্ত থাকবে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং চলমান প্রকল্পগুলোর যৌক্তিক পরিমার্জন নিশ্চিত করা গেলে এই ১০ দফা জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে।

এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে এসব বিষয়ে ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। পরে প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সুলতানা কামাল, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, নিউ এইজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র‍্যাকের সাবেক ডেপুটি চেয়ারপারসন ড. মুশতাক রাজা চৌধুরী ও শাহীন আনাম। শেষে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ অন্য অতিথিরা।

অনুষ্ঠানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘শুধু নীতিমালা, কাঠামো কিংবা মূল্যবোধের কথা বলে দেশের উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো। উন্নয়নের আকাক্সক্ষা বা নীতিগত বক্তব্য দিলেই তা বাস্তবে রূপ নেয় না। নীতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কর্মসূচি থাকতে হবে। সে কারণেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম খাতভিত্তিক নীতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।’ তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। তবে শুধু নীতিকথা যথেষ্ট নয়। এবার প্রথমবারের মতো আমরা বেশ কিছু জাতীয় কর্মসূচি সামনে আনছি, যেগুলো এসব নীতির বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাবগুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করছে বা করছে না, সেগুলোকেও নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। আমাদের বন্দোবস্তর লাগবেই, এক সংগ্রাম শেষ নতুন সংগ্রাম শুরু। যেহেতু এ বাংলাদেশ থাকবে সেহেতু আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব। তিনি বলেন, আমলাতন্ত্রকে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে এ অন্তর্বর্তী সরকার। শেষ পর্যন্ত তারা নতুন শক্তির কথা বলে শেষ বিচারে গিয়ে একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে গেলেন। সে জন্য তারা নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারলেন না। এখন প্রশ্ন হলো তারা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনটা করতে পারবেন কি না? বন্দোবস্ত বদলাতে হবে; এ অভিজ্ঞতা বন্দোবস্ত করতে কাজে লাগবে।

সময়ের আলো/এসকে/ 




Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: