সবশেষ কবে ঝামেলাহীন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) হয়েছে, তা মনে করতে গেলে বেশ লম্বা সময় ধরেই ভাবতে হবে। ১১টি আসর পার করে বিপিএলের দ্বাদশ আসর শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। বিপিএল শুরুর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নবনির্বাচিত সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানিয়েছিলেন, আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এবারকার বিপিএল অতীতের সব আসরকে ছাড়িয়ে যাবে। বাস্তবে সেটি ছাড়িয়ে গেছে ঠিকই, তবে গোছানো আয়োজন নয়, বরং অগোছালো ও সংকটের পথে।
লিগের মাঝপথে চট্টগ্রাম পর্ব বাতিল করে সিলেট থেকে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে আসা হয় আসরটি। বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল লিগ পর্বের বাকি ম্যাচগুলো। কিন্তু দুপুর পেরিয়ে বিকাল, এরপর সন্ধ্যা নামলেও দিনের কোনো ম্যাচই মাঠে গড়ায়নি। বিপিএল কার্যত থমকে গেছে, যার মূল কারণ ক্রিকেটারদের নিয়ে বিসিবির অর্থ বিভাগের চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্য।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল সোয়া ৫টা। সূচি অনুযায়ী রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ও সিলেট টাইটানসের ম্যাচ শুরুর প্রস্তুতি থাকার কথা। কিন্তু মাঠে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। গ্রাউন্ডস কমিটির কয়েকজন স্টাফ ছাড়া মাঠে আর কাউকেই দেখা যায়নি। দুই দলের কোনো ক্রিকেটার মাঠে আসেননি, কেউই হোটেল থেকে বের হননি। একই সঙ্গে মাঠ ছেড়ে ধীরে ধীরে হোটেলের দিকে ফিরতে দেখা যায় ধারাভাষ্যকার ওয়াকার ইউনুস, রমিজ রাজা, নিক কম্পটন, পারভিজ মাহরুফ, আতাহার আলী খান ও মাজহারউদ্দিন অমিকে। তখনই মিডিয়া বক্সে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, দিনের দ্বিতীয় ম্যাচটিও হচ্ছে না।
এর আগে ক্রিকেটারদের বয়কটের কারণে দিনের প্রথম ম্যাচ নোয়াখালী এক্সপ্রেস ও চট্টগ্রাম রয়্যালসের মধ্যকার লড়াইটিও মাঠে গড়ায়নি। পরে সন্ধ্যায় ধারাভাষ্যকারদের জানিয়ে দেওয়া হয়, আজকের দুটি ম্যাচই বাতিল এবং পরবর্তী ম্যাচগুলোর ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ম্যাচ না হওয়ায় বিসিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক জানিয়েছেন, বিপিএলের দ্বাদশ আসরের বাকি ম্যাচগুলো না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমনকি চলতি মৌসুমের বিপিএল স্থগিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ক্রিকেটারদের বয়কটে বিপিএলের ম্যাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। এর পেছনে মূলত বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের ক্রিকেটারদের নিয়ে করা মন্তব্যই দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিন দুয়েক আগে মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে বিসিবির পরিচালক ও ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপ না খেললে বিসিবির কোনো সমস্যা হবে না। সমস্যা হবে ক্রিকেটারদের। কারণ তারা ম্যাচ ফি, ম্যাচসেরার পুরস্কার পায়, এটি তাদের ব্যক্তিগত অর্জন।’
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। ক্রিকেটারদের পেছনে ব্যয় করা অর্থ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘আমরা তো ক্রিকেটারদের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করি। তারা ব্যর্থ হলে আমরা কি তাদের কাছ থেকে ফেরত নিই?’
এ ধরনের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিসিবি পরিচালককে যদি অব্যাহতি দেওয়া না হয় তা হলে আমরা বিপিএলের পরবর্তী ম্যাচগুলো বয়কট করব।’
এই ঘোষণার পর ক্রিকেটাররা কেউই মাঠে নামেননি, ফলে বাতিল হয়ে যায় দিনের দুটি ম্যাচই। ক্রিকেটারদের নিয়ে কটূক্তির পর সন্ধ্যায় বিসিবি এক বিজ্ঞপ্তিতে দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু তাতেও অবস্থান বদলায়নি ক্রিকেটারদের। এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে বৃহস্পতিবার ম্যাচ শুরুর আগ পর্যন্ত আলটিমেটাম দেয় কোয়াব। কবে সংবাদ সম্মেলন হবে তার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয়নি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ এবং টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস। কোয়াব সভাপতি মিঠুনসহ তিন অধিনায়ক ক্রিকেটারদের বিভিন্ন সমস্যা, এমনকি নারী ক্রিকেটারদের প্রতি যৌন নির্যাতনের বিষয়ও তুলে ধরেন।
কোয়াবের সংবাদ সম্মেলনের পর বিসিবি আবারও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, এম নাজমুল ইসলামকে ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ক্রিকেটাররা সেটিকে যথেষ্ট মনে করেননি। তারা নাজমুলকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন। যদিও বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো পরিচালককে সরাসরি অপসারণের বিধান নেই। তবে তার নিজ ক্লাব ট্যালেন্ট হান্ট যদি কাউন্সিলরশিপ বাতিল করে, তা হলে নিয়ম অনুযায়ী নাজমুল ইসলামের পরিচালক পদও হারাতে পারেন।
এ টানাপড়েনের মধ্যেই গতকাল রাত ৮টায় বিসিবি পরিচালকদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় বিসিবি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পরিবেশটাই গুমোট। কোনো পরিচালকই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক শুধু এটুকুই বলেন, ‘আমরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের খেলানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমরা চাই বিপিএলের একটি সুন্দর সমাপ্তি হোক।’
এরই মধ্যে বিসিবি কোয়াবের কাছে একটি লিখিত চিঠিও চেয়েছে বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার দিনভর এভাবেই কেটেছে দেশের ক্রিকেট।
সময়ের আলো/এসকে/