বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় তীব্র গ্যাস সংকট কাটেনি। সাড়ে ১২শ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার ২২শ টাকায়ও মিলছে না। চট্টগ্রাম নগরীতে রান্না করতে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটছেন। যাদের আত্মীয়স্বজনরা মাটির চুলা কিংবা বিকল্প উনুন ব্যবহার করেন তারা সেসব আত্মীয়স্বজনদের বাসা বা বাড়িতে ধরনা দিচ্ছেন। ডিলারদের স্টলের সামনে সারি সারি পড়ে আছে খালি সিলিন্ডার। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনেকে কিনছেন বিদ্যুৎনির্ভর চুলা। অন্যদিকে বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনগুলো। সিএনজি নির্ভর যানবাহন অটোগ্যাস স্টেশন থেকে ফিরে যাচ্ছে।
নগরীর চান্দগাঁও থানার কামালবাজার থেকে বহদ্দারহাট, চকবাজার, মুরাদপুর, কাজীর দেউড়ি, ষোলশহর, হামজারবাগ, জামাল খান, আগ্রাবাদ, হালিশহর ও পতেঙ্গা ইপিজেডসহ প্রায় সবখানেই তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। নগরীর পাশাপাশি আশপাশের উপজেলাগুলোতেও চলছে তীব্র সংকট। এসব এলাকার এলপিজি সরবরাহের দোকানগুলো খোলা রয়েছে বটে। কিন্তু খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে প্রায় সব দোকানে। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ আসলে বিক্রি করা হচ্ছে ২২শ থেকে ২৩শ টাকা দামে। সংকটকে পুঁজি করে একেকটি সিলিন্ডার আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নানা নেতিবাচক মন্তব্য।

অন্যদিকে এলপিজি সংকটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতারাও। তারা বলছেন, চড়া দামে গ্যাস কিনে আগের রেটে খাবার বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার অনেকে এলপিজি সংকটে বন্ধ রেখেছেন কেনাবেচা। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাজারে কমে গেছে মাংস বিক্রি। বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতারা মাংস কিনছেন কম। আগে ভোর থেকে শুরু করে দুপুরের মধ্যে মাংস বিক্রি শেষ হয়ে যেত। এখন সন্ধ্যা গড়ালেও অবিক্রীত থাকে মাংস। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে মাংসের দোকানেও।
নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, এলপিজি সংকটে বাসার রান্নার কাজ বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক দিন ধরে আত্মীয়স্বজনের বাসায় রান্না করে নিজের বাসায় নিয়ে আসছি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার একটি গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়ার পর সংকট কিছুটা কমেছে। সাড়ে ১২শ টাকার এই সিলিন্ডার কিনেছি ২৩শ টাকা দিয়ে।
নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মোরশেদ আলম বলেন, নতুন নির্মিত কোনো ফ্ল্যাটে প্রাকৃতিক গ্যাসের লাইন নেই। তাই আমরা দীর্ঘদিন ধরে এলপিজি সিলিন্ডার দিয়ে রান্নার কাজ চালিয়ে আসছি। হঠাৎ করে সিলিন্ডার সংকটে দুর্ভোগের শেষ নেই। চড়া দামে কিনতে চাইলেও সরবরাহ মিলছে না।
সরকার আগেভাগে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিলে বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। চট্টগ্রাম মহানগর এলপি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, চট্টগ্রামে সংকট শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহ আগে থেকে। তখনকার সময় থেকে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং আরও খারাপ হয়েছে। এখন সংকট আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রামে আটটি প্রতিষ্ঠানের স্টোরেজে গ্যাস নেই। আমদানি না থাকায় এই অবস্থা। তাই প্লান্টে বোতলজাতকরণের কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এলপিজি সংকট শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার নজর দেওয়ার দরকার ছিল। সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। আমদানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চলমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগে অনেকে মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সুযোগ নিচ্ছে। তারা সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে চড়া দাম নিচ্ছে।
সংকটে অটোগ্যাস স্টেশন : সারা দেশের এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশনে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে না। এলপিজি এবং লাইনের গ্যাস দুই ক্ষেত্রেই সংকট চলছে। এই সময় অটোগ্যাস স্টেশনে চলমান সংকটের কারণে যানবাহন চলাচলেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
ডিলাররা জানান, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক ফিলিং স্টেশনের পাশাপাশি এলপি গ্যাসনির্ভর গ্যাস স্টেশন আছে। যা অটোগ্যাস স্টেশন নামে পরিচিত। ফিলিং স্টেশনে যানবাহনে সরাসরি গ্যাস ভর্তি করা হয়। আর অটোগ্যাস স্টেশনে যানবাহনের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় সিলিন্ডার। চট্টগ্রাম নগরীতে অন্তত ১০টি অটোগ্যাস স্টেশন আছে। এসব স্টেশনেও এখন সিলিন্ডারের তীব্র সংকট চলছে।
বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে গেল ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এতে সংগঠনের নেতারা বলেছেন, দেশে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিকটন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। যার মধ্যে যানবাহন খাতে ১৫ হাজার মেট্রিকটন অর্থাৎ ১০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। চলমান এলপি গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাত ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।
তারা বলছেন, এলপিজি অটোগ্যাস একটি পরিবেশবান্ধব, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি- যা সিএনজি, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের বিকল্প হিসেবে যানবাহনে ব্যবহার হয়ে আসছে। যানবাহনে এলপিজি ব্যবহারের বিভিন্ন সুবিধার জন্য সরকারের উৎসাহে সারা দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় এক হাজার এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপিত হয়। যার ওপর ভিত্তি করে প্রায় দেড় লাখ গাড়ি এলপিজিতে কনভার্ট হয়েছে। বর্তমানে এলপিজির সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে স্টেশন মালিক ও এলপিজি চালিত গাড়ির মালিকরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশন ঘুরেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং যাত্রীসেবায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
সংকট নিরসনে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- এলপিজি সরবরাহ কোম্পানিগুলো (অপারেটর) যেন এলপিজি অটোগ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করে সে জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সরকারি অথরিটি যেন এলপিজি আমদানি সংক্রান্ত কোনো জটিলতা থাকলে তা সমাধানের ব্যবস্থা করে। সুলভমূল্যে সহজলভ্য ও নিরবচ্ছিন্নভাবে যাতে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও অপারেটরের মাধ্যমে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে সরকার যে লিমিট দেয় তা যেন প্রত্যাহার করা হয়। কারণ অনেক অপারেটরের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লিমিটের কারণে অতিরিক্ত এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, পাশাপাশি দেশের ৩০টি অপারেটরকে এলপিজি স্টোরেজ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া।
এ বিষয়ে সাইফুল আলম বলেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে এই মুহূর্তে তেমন সংকট নেই। তারা প্রাকৃতিক গ্যাস পাচ্ছে লাইনের মাধ্যমে। ফিলিং স্টেশনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীতে ১০টি অটোগ্যাস স্টেশন আছে। যারা শুধু যানবাহনে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করে। এসব স্টেশনে এলপিজি না থাকায় বন্ধের মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে স্টেশন মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরেছেন।
এএডি/