যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গাজায় শান্তি পুনর্গঠনের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বোর্ড অফ পিস বা ‘শান্তি পরিষদের’ জন্য সদস্যপদ আহ্বান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ পরিষদে যোগদানের জন্য দেশগুলোর কাছে ১০০ কোটি ডলার অর্থ অনুদান দেওয়ার শর্ত দিয়েছেন তিনি।
এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ব্লুমবার্গ। সদস্য দেশগুলোর অনুদানের হিসাব নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্পের হাতেই থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বোর্ডের খসড়া চার্টারের নিয়ম অনুযায়ী, বোর্ড অফ পিসের প্রথম চেয়ারম্যান হবেন ট্রাম্প । নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভেটো ক্ষমতা থাকবে। কোনো দেশ তিন বছরের বেশি সময় সদস্য থাকতে পারবে না, তবে প্রথম বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দেওয়া হলে মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব।
ইতোমধ্যে গাজার এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছে হোয়াইট হাউস। তারা হলেন- সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। বোর্ড যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসন ও পুনর্গঠন তদারকি করবে।
ব্লুমবার্গ বলছে, বোর্ড অব পিসের অধীনে একটি এক্সিকিউটিভ বোর্ডও গঠনের কাজ চলছে। এরই মধ্যে এই বোর্ডের সদস্যদের নামও ঘোষণা করা হয়েছে। এই বোর্ড যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার ব্যবস্থাপনা দেখভাল করবে। এতে আরও কয়েকজন বিশ্বনেতা থাকবেন, যাদের নাম আগামী সপ্তাহে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ঘোষণার কথা রয়েছে।
গতকল শনিবার এই বোর্ডের সনদটি বিশ্বের ডজনখানেক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে পাঠানো হয়, তাদের সদস্যপদের আমন্ত্রণ জানিয়ে। নথিতে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়তে চাইছেন।
সনদে বোর্ড অব পিসকে বর্ণনা করা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে, যার লক্ষ্য হলো সংঘাত-আক্রান্ত বা সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনা, আইনসম্মত ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করা। তিনটি সদস্যরাষ্ট্র সমর্থন দিলেই এই সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
তবে, এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। শনিবার ইসরায়েল এই বোর্ডের সদস্যের তালিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলী সাওয়াদি এবং মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেছে তারা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, গাজার এক্সিকিউটিভ বোর্ডের গঠন নিয়ে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়নি এবং এটি দেশটির নীতির পরিপন্থী। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন ইসলামিক জিহাদও এই কমিটির গঠন নিয়ে সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, এই বোর্ড ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানায়, বোর্ডটি ইসরায়েলি মানদণ্ড অনুযায়ী গঠিত হয়েছে এবং এটি দখলদার শক্তির স্বার্থে কাজ করবে। এতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আগেই খারাপ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
হোয়াইট হাউস বলেছে, এই বোর্ড কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে উন্নত মানের সেবা নিশ্চিত করবে। গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডটি মূল এক্সিকিউটিভ বোর্ড থেকে আলাদা। যদিও উভয় বোর্ডে অনেক সদস্য একই থাকবেন, গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড শুধু গাজার পুনর্গঠন প্রকল্প তদারক করবে। আর মূল এক্সিকিউটিভ বোর্ড পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপর বিস্তৃত নজরদারি চালাবে।
ট্রাম্প বোর্ডের মাধ্যমে জাতিসংঘের বিকল্প আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়তে চাইছেন- এটি বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। বোর্ডের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক হবে, যখন কমপক্ষে তিনটি দেশ চার্টারে সম্মত হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের অর্থ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রিক পদক্ষেপগুলো অনেকের কাছে ঔপনিবেশিক রীতির মতো মনে হচ্ছে। ফক্স নিউজের বিশ্লেষক গায় বেনসন বলেছেন, জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে আইডিয়াটি ভালো, কিন্তু ট্রাম্পের একক নিয়ন্ত্রণে সব দেশই যুক্ত হওয়া কঠিন।
সময়ের আলো/এসকে/