জনবল সংকট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ জনবল সংকট চলমান থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে

2026-01-19T11:55:59+00:00
2026-01-19T11:55:59+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
জনবল সংকট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম 
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি : সংগৃহীত
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ জনবল সংকট চলমান থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কনসালটেন্ট পদ শূন্য থাকা এবং একাধিক চিকিৎসকের বিনা ছুটিতে কর্মস্থল ত্যাগের কারণে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রায় দেড় লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ১৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। এর মধ্যেও জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. আলাউদ্দিন এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি) ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘদিন ধরে বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত রয়েছেন। ডা. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে এবং ডা. নাবিলা নুজহাতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। 

জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) ডা. সাবরিনা মেহের গত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে যোগদান করলেও গত বছরের মে মাস পর্যন্ত তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন (প্রতি বুধবার) অফিস করেছেন বলে জানা গেছে। যোগদানের পর থেকে ওই বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ২৭টি এবং গত বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১২টি সহ মোট ৩৯টি সিজার (অপারেশন) সম্পন্ন করেন তিনি। এপ্রিল ও মে মাসে একটি করে সিজার হলেও জুন মাসের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সিজার অপারেশন হয়নি।

এদিকে, গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে তিনি বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে। হাসপাতালের কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন স্টাফ দাবি করে বলেন, মাসে এক বা দুই দিন ডা. সাবরিনা মেহের আসেন, এসে হাসপাতালের কোন কাজ না করেই চলে যান। তিনি হাসপাতালে আউটডোরে রোগী দেখতে পারেন, সেটাও তিনি করেন না।

সরেজমিনে দীর্ঘ ছয়মাসে তার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে সর্বশেষ গত বছরের ১১ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কর্মস্থলে উপস্থিত হন জানতে পেরে তাকে হাসপাতালের দোতলায় নার্সিং সুপারভাইজারের রুমে পাওয়া যায়। এসময় ডা. সাবরিনা মেহেরের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, চলতি বছরের জুন-জুলাই এই দুই মাস আমি ছুটিতে ছিলাম এবং তারপর থেকেই হাসপাতালে আসছি, অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত নয়। তাই আপাতত অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। অপারেশন না হলে আমি কর্মস্থলে এসেই বা কী করব।

হাসপাতালে বর্তমানে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), অর্থোপেডিক, চক্ষু, ইএনটি, চর্ম ও যৌন, ইএমও ও আইএমও এই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে মাত্র ৭ জন কর্মকর্তার ওপর ভর করে চলছে পুরো হাসপাতালের কার্যক্রম। বর্তমানে দায়িত্বশীল ১৩ জন কনসালট্যান্টের বিপরীতে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও), তিনজন মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল অফিসার (হোমিও), ডেন্টাল সার্জন এবং একজন এনেসথেটিস্ট দিয়ে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা
কনসালট্যান্টের

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই হাসপাতালটিতে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা চিকিৎসার জন্য আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় অনেক গুরুতর রোগীকে জীবন ঝুঁকিতে রেখে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বলেন, ডাক্তার না থাকায় আমরা কেউ আশানুরূপ চিকিৎসা পাচ্ছি না। যার ফলে আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে।

এদিকে মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করা রোগী বলেন, আমার হাত, পা ছিলে গেছে। আমি এখানে চিকিৎসা নিতে আসছি কিন্তু এখানে চিকিৎসা নিতে এসে দেখি ডাক্তার নেই তারপর ডাক্তারের সরকারি আমার ডেসিং করে দিয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক রোগীর পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

এদিকে প্রতিদিন আউটডোরে ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে উপসহকারী দিয়ে রোগী দেখানো হচ্ছে, যা রোগীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.মারুফ হাসান বলেন, আমি যোগদানের পর থেকেই গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহেরের অনুপস্থিত লক্ষ করতে পারি এবং অল্প কিছু দিন পরেই তিনি ছুটির আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এখানে গাইনি কনসালটেন্ট না থাকায় তার ছুটি অনুমোদন করা হয়নি। তিনি আমার চাকরিতে সিনিয়র হওয়ায় তাকে জোরালোভাবে কিছু বলতেও পারিনি। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল এবং আপাতত তার বেতন বন্ধ রয়েছে। তবুও তিনি নিয়মিত অফিস করছেন না। ফলে জুন মাস থেকেই পুরোপুরি সিজার বন্ধ রয়েছে। 

তবে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহের নিয়মিতভাবে কর্মস্থলে আসলে ওটির সমস্যার দ্রুত সমাধান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সিজার করার জন্য এতদিন সক্ষম থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শরীফ ইসলাম বলেন, এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধু গোয়ালন্দ নয়, পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও চিকিৎসা নিতে আসে। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় দুর্ঘটনার রোগীর চাপও বেশি। ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রায়ই মেঝেতে রোগী রাখতে হয়। 

তিনি আরও জানান, ভর্তি রোগীদের সরকারিভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ঔষধ দেওয়া সম্ভব হলেও বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। 

অপারেশন থিয়েটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কিছু ধুলোবালি জমেছে, তবে গাইনি চিকিৎসক নিয়মিত এলে সেটা একদিনের মধ্যেই অপারেশন চালুর ব্যবস্থা করা সম্ভব। আর অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকলেও তো তিনি আউটডোরে রোগী দেখতে পারেন। আউটডোরে রোগী দেখা তো তার জন্য নিষেধ নেই। 


জনবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আসন্ন ৪৮তম বিসিএস থেকে নতুন নিয়োগ এলে সংকট কিছুটা কাটতে পারে বলে তার ধারণা। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত জনবল সংকট নিরসন না হলে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারসহ জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে, যার চরম খেসারত দিতে হবে উপজেলার সাধারণ মানুষের।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   রাজবাড়ী  গোয়ালন্দ  উপজেলা  স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: