লাইটার জাহাজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বিঘ্নিত হচ্ছে বড় জাহাজের পণ্য খালাস। আবার খালাস করা পণ্য নিয়ে লাইটার জাহাজ ভেসে আছে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙর ও নৌবন্দরে। দৈনিক একশ লাইটার জাহাজের বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ৫০টির কম। এতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস চেইন ভেঙে পড়েছে। রমজানের আগে সৃষ্ট সংকটের কারণে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন আমদানিকারকরা।
অভিযোগ আছে, যোগসাজশে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হচ্ছে না। লাইটার জাহাজকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাসমান গুদাম হিসেবে। তবে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল বলছে, ঘাটে পণ্য খালাসের সিডিউল মিলছে না। তাই জাহাজগুলো পণ্য নিয়ে ভেসে আছে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণে আজ (মঙ্গলবার) ঢাকার আগারগাঁওয়ে নৌপরিবহন অধিদফতরে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকতে গতকাল স্টেকহোল্ডারদের কাছে দেওয়া হয়েছে চিঠি।
অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠি দেওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, নৌবাণিজ্য অধিদফতরের প্রিন্সিপাল অফিসার, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল, কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে। চিঠিতে বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, রমজান মাসকে সামনে রেখে কতিপয় আমদানিকারক লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের অভাবে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। যার ফলে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানি পণ্য খালাসে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে এবং পণ্য মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভাসমান মাদার ভেসেল থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করতে এবং ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে অধিদফতরে সভা আহ্বান করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল হয়ে জেটিতে পণ্য খালাস শুরুর আগে মাদার ভেসেলকে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হয়। কারণ এসব জাহাজের ড্রাফট (পানির লেভেল থেকে জাহাজের নিচের অংশ পর্যন্ত) ১২ থেকে ১৪ মিটার পর্যন্ত। এ সময় বন্দর বহির্নোঙরে ছোট ছোট লাইটার জাহাজে করে পণ্য খালাস করা হয়। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন পণ্যের জাহাজগুলো ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকে। একই সময় ড্রাফটের পরিমাণও কমতে থাকে। মাদার ভেসেলের ড্রাফট ১০ মিটারের নিচে নেমে এলে বহির্নোঙর থেকে জেটিতে ভেড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর বহির্নোঙরের পরিবর্তে জেটিতেই চলে পণ্য খালাস।
এভাবে বড় জাহাজ ভেড়া থেকে পণ্য খালাস শেষ করা পর্যন্ত পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের জোগান নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেলে ভেসে থাকে বহির্নোঙরে। এতে বেড়ে যায় বড় জাহাজের ডেমারেজ বা ক্ষতিপূরণ বাবদ চার্জ। গত এক মাস ধরে মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজের সংকট চলছে। এতে পণ্য খালাস ছাড়াই বহির্নোঙরে ভেসে আসে মাদার ভেসেল।
একই সময় খালাস করা পণ্য নিয়ে বিভিন্ন নদী বন্দরের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি নদীতে ভেসে আছে লাইটার জাহাজগুলো। ভেসে থাকা জাহাজগুলো নতুন করে মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে যুক্ত হতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের জোগান মিলছে না। ফলে পণ্য পরিবহন নিয়ে চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
লাইটার জাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল সংগঠনের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, দেশের আমদানি প্রবাহ বাড়ছে। সে তুলনায় পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ নেই। গত এক মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায় হঠাৎ করে পণ্য আমদানি বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রমজানকেন্দ্রিক ভোগ্য পণ্যের আমদানি বেড়েছে। এসব পণ্য নিয়ে একসঙ্গে বেশি জাহাজ বন্দরে ভেড়ায় জাহাজ সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার বিষয়টি সঠিক নয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, লাইটার জাহাজ পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। এসব জাহাজ তদারকি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ কিংবা ডিজি শিপিংয়ের কোনো ধরনের কার্যকর ভূমিকা নেই। যার কারণে খেয়াল খুশি মতো পরিচালনা হচ্ছে। তাই বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে মাঝেমধ্যে ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়।
দেশের নৌ বন্দরের ঘাটগুলো পুরোনো হওয়ায় খালাসে বিঘ্ন ঘটে জানিয়ে তিনি বলেন, লাইটার জাহাজকে শুধু ভাসমান গুদাম বলে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। ঘাটগুলোতে দ্রুত এবং আধুনিক পদ্ধতিতে পণ্য খালাস কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে পণ্যভর্তি লাইটার জাহাজগুলোকে ঘাটের কাছেই ভেসে থাকতে হয়।
লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী শফিক আহমদ বলেন, লাইটার জাহাজ চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ জন্য চলমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আশা করি সংকট কেটে যাবে।
বড় ও ছোট জাহাজে লাখ লাখ টন পণ্য : চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙর করা আছে শতাধিক বড় জাহাজ। এসব জাহাজে আছে অন্তত ৪০ লাখ টনের বেশি পণ্য। এর মধ্যে ১৫টি বড় জাহাজে ১০ লাখ টনের বেশি আছে রমজানের পণ্য।
এসবের মধ্যে আছে সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্য তেল। প্রতিটি মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে খালাস হয় পণ্য। সেই পণ্য নদীবন্দর ঘাটে পরিবহন করে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করা যায়। চলমান লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে অপেক্ষার সময় বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। সৃষ্ট সংকটের জন্য নানা কারণ তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রধান দুটি কারণকে সংকটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ঘন কুয়াশার কারণে নদীপথে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এবং একযোগে ছয় শতাধিক পণ্যভর্তি লাইটার জাহাজ খালাস ছাড়াই ভেসে থাকা। পাশাপাশি শ্রমিক ও ট্রাক সংকটও আছে। এসব সংকটের কারণে ঘাটে পণ্য খালাস শুরু করতে পারছে না অনেক জাহাজ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলো উদ্যোগ নিলে কোনো লাইটার জাহাজ ভেসে থাকতে পারে না। কিন্তু তদারকি সংস্থাগুলো একেবারে নিষ্ক্রিয়। কত জাহাজে কত পণ্য কোথায় ভেসে আছে সংশ্লিষ্টদের কেউ খবর রাখে না। আবার ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি চলেছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে লাইটার জাহাজের পণ্য পরিবহনে। অথচ বাজারে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে হলে বড় জাহাজ থেকে দ্রুত সময়ে খালাস শেষ করতে হবে। পাশাপাশি ঘাটে দ্রুত সময়ে লাইটার জাহাজের পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে। হঠাৎ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা তৎপর হলে সংকটের দ্রুত সমাধান হবে না।
এফআর