আজ ২০ জানুয়ারি, ঐতিহাসিক শহিদ আসাদ দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এটি তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। তার এই আত্মত্যাগ ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয় এবং গণঅভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তোলে। একই সঙ্গে প্রশস্ত করে মুক্তিযুদ্ধসহ পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের পথ।
আজ মঙ্গলবার ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক আসাদুজ্জামান আসাদের ৫৭তম মৃত্যুবার্ষিকী।
আসাদুজ্জামান আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মেধাবী ও সাহসী এই ছাত্রনেতা ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে আসাদ ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও আপসহীন।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তাল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, সামরিক শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠছিল। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার এক সমাবেশ থেকে ১১ দফা দাবির বাস্তবায়ন এবং ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই সমাবেশ থেকেই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ২০ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানায়।
ধর্মঘট ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ জানুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা ছাত্রসমাজকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ছাত্র-জনতার ১১ দফা কর্মসূচির মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শহিদ হন এবং অনেকে আহত হন।
শহিদ আসাদের এই আত্মত্যাগ চলমান আন্দোলনকে বেগবান করে। স্বাধিকারের দাবিতে সোচ্চার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, যা পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পতন ঘটে স্বৈরাচার আইয়ুব খানের।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী শহিদ আসাদ বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রেমী ও মুক্তিকামী মানুষের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার আত্মত্যাগ আমাদের নতুন প্রজন্মকে দেশের জন্য নিজের দায়িত্ব পালন করতে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে যুগে যুগে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে ২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদ দিবস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রতিবারের মতো এবারও আজ সকাল ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মূল ফটকের সামনে নির্মিত শহিদ আসাদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, গান ও কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করা হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের লড়াকু সাংস্কৃতিক জোট ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের’ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শহিদ আসাদের সহযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
এফআর