গাজা উপত্যকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই পর্ষদে স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে ১০০ কোটি ডলার অনুদানের শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
বিবিসি ও রয়টার্সের খবর থেকে জানা গেছে, এমন উদ্যোগকে ক্ষমতানির্ভর কূটনীতি আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছে ইউরোপ। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন থেকে ক্ষমতাকে বড় করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত-পাকিস্তানসহ প্রায় ৬০ দেশের কাছে এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের সতর্ক প্রতিক্রিয়া : ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণে সরকারগুলো রোববার সতর্ক ও সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
কূটনীতিকদের মতে, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের কার্যক্রম, বৈধতা ও বহুপক্ষীয় কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে।
প্রায় ৬০টি দেশে এই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে, যা শনিবার ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে পৌঁছাতে শুরু করে। তবে এখন পর্যন্ত কেবল হাঙ্গেরি, যার প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র; নিঃশর্তভাবে এতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যান্য সরকার প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনীহা দেখিয়েছে।
ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের ভূমিকা কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে তারা গভীর উদ্বিগ্ন।
আজীবন চেয়ারম্যান ট্রাম্প : রয়টার্সের দেখা আমন্ত্রণপত্র ও খসড়া সনদ অনুযায়ী, আজীবনের জন্য বোর্ডটির চেয়ারম্যান হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বোর্ডটি প্রথমে গাজা সংঘাত নিয়ে কাজ করবে এবং পরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতে ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সনদে বলা হয়েছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মেয়াদ হবে তিন বছর। তবে কোনো দেশ যদি বোর্ডের কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার (১০০ কোটি ডলার) দেয়, তা হলে তারা স্থায়ী সদস্যপদ পাবে।
হোয়াইট হাউস এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছে, ‘এটি এমন অংশীদার দেশগুলোকে স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাব, যারা শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি গভীর অঙ্গীকার দেখাবে।’
ট্রাম্প ইউনাইটেড নেশন্স : আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে একটি চার্টার সংযুক্ত থাকায় ইউরোপের কয়েকটি সরকারের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ট্রাম্প এর আগেও জাতিসংঘকে বারবার সমালোচনা করেছেন বিশ্ব সংঘাত নিরসনে তার উদ্যোগগুলোকে সমর্থন না করার অভিযোগ তুলে।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, এটি আসলে এক ধরনের ‘ট্রাম্প ইউনাইটেড নেশন্স’, যা জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলোকে উপেক্ষা করে। আরও তিনজন পশ্চিমা কূটনীতিক মনে করেন, এই বোর্ড কার্যকর হলে জাতিসংঘের প্রভাব ও বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গাজার বাইরে বিস্তৃত ভূমিকার পরিকল্পনা : তিনজন কূটনীতিক ও এক ইসরাইলি সূত্রের মতে, ট্রাম্প চান বোর্ড অব পিস ভবিষ্যতে গাজার বাইরেও বিস্তৃত ভূমিকা পালন করুক, যেসব সংঘাত তিনি সমাধান করেছেন বা করবেন বলে দাবি করেন। আমন্ত্রিতদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় কমিশন এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা অবশ্যই এই সম্মানজনক আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি।’
জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া : যুক্তরাষ্ট্র দায়মুক্তির মনোভাব নিয়ে আচরণ করছে এবং তারা আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিবিসি রেডিও ফোর টুডের প্রোগ্রামে এমন কথাই বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের ‘স্পষ্ট বিশ্বাস’ হচ্ছে এই যে, সমস্যার বহুপক্ষীয় সমাধান অবান্তর। যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও ক্ষমতা প্রয়োগ। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে খুবই কমই।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক স্কাই নিউজকে বলেন, ‘যদি আমরা জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করি, তা হলে আমরা খুব, খুব অন্ধকার সময়ের দিকে ফিরে যাব।’
নতুন শান্তি কাঠামো, নাকি ভাঙন : ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগ একদিকে যেমন গাজা সংকটে দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে তা বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ১০০ কোটি ডলারের স্থায়ী সদস্যপদ, আজীবন চেয়ারম্যানশিপ, জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে নতুন কাঠামো; সব মিলিয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্কতা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি একটি গভীর কাঠামোগত উদ্বেগের প্রতিফলন।
এই উদ্যোগ সত্যিই বৈশ্বিক শান্তির নতুন পথ খুলবে, নাকি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে আরও বিভক্ত করবে, সেই উত্তর এখনও অনিশ্চিত।
এফআর