অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় আর একরাশ নাটকীয়তায় আফ্রিকান নেশন্স কাপের ফাইনাল যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাল। রেফারি আর ভিএআর নিয়ে চরম বিতর্ক, রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে কোচের ডাকে ফুটবলারদের মাঠ ত্যাগ, আর শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চকর গোল— সব মিলে রাবাতের রাতটি ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে। এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে স্বাগতিক মরক্কোকে ১-০ গোলে হারিয়ে আবারও আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পুনরুদ্ধার করে সেনেগাল।
মরক্কোর মাটিতে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনার বারুদ। ২০২১ সালের চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল তাদের হারানো মুকুট ফিরে পেতে ছিল মরিয়া। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই লিড নিতে পারত তারা, কিন্তু সতীর্থের নিখুঁত ক্রস থেকে গোলরক্ষক বরাবর হেড করে সুযোগ নষ্ট করেন পাপ গেয়ি। ৩৭ মিনিটে ইলিমান গোলরক্ষককে একা পেয়েও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে প্রথমার্ধে মরক্কোর নায়েফ গোলের সহজ সুযোগ হাতছাড়া করলে গোলশূন্যভাবে বিরতিতে যায় দুদল।
দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো আক্রমণের পসরা সাজালেও তাদের সব প্রচেষ্টা গোললাইনের সামনে এসে থমকে যাচ্ছিল। ৬৭ মিনিটে এল আইনাউই প্রতিপক্ষ ফুটবলারের মাথায় লেগে রক্তাক্ত হলেও কপালে ব্যান্ডেজ বেঁধে যেভাবে খেলা চালিয়ে গেছেন, তা প্রশংসা কুড়িয়েছে দর্শকদের। নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ দিকে সেনেগালের ইসমাইল সার জালে বল পাঠালেও রেফারি ফাউলের অজুহাতে তা বাতিল করে দিলে শুরু হয় আসল নাটক। ইদ্রিসা গেয়ি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় আশরাফ হাকিমিকে মৃদু ধাক্কা দিয়েছিলেন, যা নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ ছিল।
সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালে যোগ করা সময়ে মরক্কোর পাওয়া একটি পেনাল্টি। ভিএআর দেখে রেফারি যখন স্পট কিকের সিদ্ধান্ত দেন, তখন সেনেগাল শিবির ক্ষোভে ফেটে পড়ে। কোচ পাপ ঝাও তার খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে ড্রেসিং রুমে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মাঠের মাঝখানে কেবল সাদিও মানে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকার পর সেনেগাল ফুটবলাররা মাঠে ফিরে আসেন। পেনাল্টি নিতে আসেন রিয়াল মাদ্রিদে খেলা তারকা ব্রাহিম দিয়াস। কিন্তু তিনি যে শটটি নিলেন, তা হয়তো নিজের দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি। দুর্বল একটি ‘পানেনকা’ শট গোলরক্ষক নড়াচড়া না করে জায়গায় দাঁড়িয়েই তালুবন্দি করেন।
নির্ধারিত সময়ে গোলের দেখা না মেলায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯৪ মিনিট) পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন পাপ গেয়ি। ইদ্রিসা গেয়ির দুর্দান্ত এক থ্রু বল ধরে ডি-বক্সে ঢুকেই বুলেট গতির কোনাকুনি শটে মরক্কোর জাল কাঁপান তিনি। পিছিয়ে পড়ে মরিয়া মরক্কো সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে, কিন্তু নায়েফের হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে তাদের দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর অপেক্ষার অবসান আর হয়নি।
মরক্কোর ঘরের মাঠে আরব কাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস
থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেনেগালের লড়াকু মানসিকতার কাছে হার মানতে হয়েছে তাদের। তবে মাঠের ভেতরে কোচের নির্দেশে খেলোয়াড়দের বেরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ফুটবলের সৌন্দর্যকে কিছুটা হলেও ম্লান করেছে। সব বিতর্ক পেছনে ফেলে ২০২১ সালের পর ২০২৬-এ এসে আবারও আফ্রিকার মুকুট ফিরে পেল সেনেগাল।
এফআর