আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে দেশে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট ব্যবহার করা হবে। পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল বার্তা দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে এমন কিছু ঘটেনি যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের এক ঠিকানায় ৪৯০টি পোস্টাল ব্যালট পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতে শতাধিক পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ করে সেসব নিজেদের মধ্যে বণ্টন ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে একদল প্রবাসী বাংলাদেশিকে। বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থক কিছু ব্যক্তি তাদের নিজ ঠিকানায় এসব ব্যালট সংগ্রহ করে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম সিল মেরে রাখছেন এমন দাবি করেছেন কয়েকজন প্রবাসী। এ ছাড়া সৌদি আরবেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় দেখা গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মূলত যেসব বাংলাদেশি কর্মী আছেন, তারা মূলত অদক্ষ কর্মী এবং অল্পশিক্ষিত। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বেশিরভাগ কর্মীই একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকেন। তাদের বেশিরভাগেরই ঠিকানা একই জায়গাতে। আবার সব বাংলাদেশি কর্মীর পক্ষে সশরীরে দূতাবাস বা মিশনে হাজির হয়ে ব্যালট পেপার গ্রহণ করা সম্ভব না। কারণ বাংলাদেশি বেশিরভাগ কর্মীরা ব্যালট পেপার সংগ্রহ করার জন্য প্রয়োজনীয় ছুটি ম্যানেজ করতে পারেন না। ফলে তারা যে আবাসস্থলে গাদাগাদি করে থাকেন অথবা ওইসব কর্মীর যে সমন্বয়ক আছেন তাদের ঠিকানায় ব্যালট পেপারগুলো পাঠানো হয় এবং তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মতি নিয়েই। এ ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বা ভোট বিতর্কিত হতে পারে, এমন কোনো কর্মকাণ্ড ঘটেনি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে সেসব ক্ষেত্রে অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না তা এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। যার মধ্যে বাহরাইনের ডাক বিভাগ একটি তদন্ত করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের কর্মকাণ্ড দুর্নীতিমুক্ত রাখতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের তিনটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা থেকে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে প্রবাসীদের এই পোস্টাল ব্যালট নির্ধারণ করা হয়। যে কেউ চাইলেই পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবে না। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে চাইলে সবার আগে ইসির (নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে) কাছে নিবন্ধন করতে হবে। যে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় নম্বর আছে তিনিই এই নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধনের সময় নিজের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনের নম্বর যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় ওই ব্যক্তির নামও থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয় নম্বর এবং ভোটার তালিকায় নাম দুটিই থাকতে হবে। তা না হলে পোস্টাল ব্যালট কাজ করবে না। নিবন্ধনের পর নিজের ব্যবহার করা (যা নিবন্ধনের সময় উল্লেখ করা হয়েছে) মোবাইল ফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। নিজের ব্যবহার করা মোবাইল ফোন দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান না করলে তা কাজ করবে না। কাজেই এক ঠিকানায় একাধিক পোস্টাল ব্যালট গেলেও তা যে কেউ ইচ্ছা করলেই ব্যবহার করতে পারবে না।
নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বাহরাইনের এক ঠিকানায় ১৬০টি ব্যালট ছিল। কোনো খাম খোলা হয়েছে, এরকম কিছু ভিডিওতে দেখা যায়নি। বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বিষয়টি দেখছেন। পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনুসরণীয় পদ্ধতির ব্যতিক্রম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে জানাবে বাহরাইনের ডাক বিভাগ। পোস্টাল ভোটের ব্যালট পাওয়ার আনন্দটুকু ধরে রাখতে কেউ এটা ভিডিও করে পোস্ট করেছেন। তবে এটা করা উচিত হয়নি। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে ইসি পোস্টাল ব্যালটগুলো পাঠাচ্ছে। একেক দেশে পোস্টালব্যবস্থা একেক রকম। বাহরাইনের ক্ষেত্রে ১৬০টি পোস্টাল ব্যালট কোনো এক জায়গায় বক্সে (পিজিয়ন হোলের মতো) দেওয়া হয়েছে। ছাত্রজীবনে হোস্টেলে যেমন একটা জায়গায় চিঠিপত্র রেখে যেত, একটা টেবিলের ওপরে, আমরা সেখান থেকে নিজেরা নিজেরা নিয়ে নিতাম। সেরকম একটা বক্সে ১৬০টি ব্যালট দিয়ে গেছে। ওই বক্সটা যখন বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা এসে খুলেছেন, চার-পাঁচজন, তখন তারা ওটা ভাগ করে যে যার ঘরে নিয়ে গেছে। বিষয়টি তাৎক্ষণিক বাহরাইন পোস্টকে জানানো হয়েছে। তারা সরেজমিন তদন্ত করে জানাবে, এটা কেন ঘটল। তাদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা ছিল, সেখানে কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানিয়েছে, প্রথমবারের মতো প্রবাসে থাকা ভোটার ও ভোটের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালু করে নির্বাচন কমিশন। এই পদ্ধতিতে ভোট দিতে এবার ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ায় মালয়েশিয়া ও ইতালি থেকে ৫ হাজার ৬০০ পোস্টাল ব্যালট ফেরত এসেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত এসেছে ৪ হাজার এবং ইতালি থেকে ফেরত এসেছে ১ হাজার ৬০০ পোস্টাল ব্যালট।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যা দেখেছি তা কতটুকু সঠিক তা জানি না। এগুলো নির্বাচন কমিশন তদন্ত করছে, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সত্য-মিথ্যা বোঝা যাবে। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা যুগান্তকারী ঘটনা।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বার্তা ছড়িয়েছে তা কি ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তাগুলো আমি দেখেছি কিন্তু ওগুলো কতটুকু সত্য তা বলতে পারছি না। নির্বাচন কমিশন বলছে যে ওইসব ঘটনায় ভোটে অনিয়ম ঘটতে পারে এমন কিছু নাই। আমি নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে চাই।
সার্বিকভাবে পোস্টাল ব্যালটের কার্যক্রমের ওপর আপনি সন্তুষ্ট কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে প্রবাসে কী হচ্ছে আমি সেটার বিস্তারিত জানি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা ছড়িয়েছে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে উদ্বেগের এমন কিছুই ঘটেনি। কারও ওপর তো বিশ্বাস রাখতে হবে। আমি নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করতে চাই।
সময়ের আলো/এনএ