সনাতন
ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উৎসব সরস্বতী পূজা আজ। ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাস্ত্রমতে
এ দিনটিতেই জন্মেছিলেন দেবী সরস্বতী। তিনি শ্বেতশুভ্রবসনা। দিনটিকে বলা হয়
‘বসনমশ পঞ্চমী’। সরস্বতী জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী। এ জন্য ভক্তরা বিশেষ করে
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দিরগুলোতে সরস্বতী পূজার আয়োজন
করে। দেবীর এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তাকে বীণাপাণিও বলা হয়।
আজ
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ দেবী সরস্বতীর বন্দনায় ঢাক-ঢোল-কাঁসর,
শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে। শাস্ত্রমতে প্রতি বছর মাঘ মাসের
শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর বন্দনা করা হয়।
সনাতন
ধর্মের শাস্ত্রমতে সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। নামের অক্ষর বিশ্লেষণে এর
অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। ‘সরস’ শব্দের অর্থ জল; তাই ‘সরস্বতী’ অর্থ ‘জলবতী’
বা নদী। পরবর্তী সময়ে জ্ঞান-বিদ্যার প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি। আবার বাগদেবী,
বিদ্যাদেবী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া নামেও তিনি পরিচিত। দেবীর চার
হাতের মধ্যে একটিতে বীণা, একটিতে পুস্তক, একটিতে মালা এবং অন্যটিতে
জলপাত্র থাকে। অনেক জায়গায় তিনি দুই হাতে বীণা ধারণ করেও পূজিত হন। সরস্বতী
শুধু বিদ্যার দেবী নন; সংগীত, সাহিত্য, শিল্পকলারও রক্ষক তিনি। এই
বিশ্বাসে শত শত বছর আগেও দেবী সরস্বতীর পূজা করা হতো। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ
বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতসহ নানা সাহিত্যকর্মে দেবী সরস্বতীর
বিভিন্ন কাহিনি ও রূপের বিবরণ পাওয়া যায়।
পঞ্জিকা মতে,
ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং
শক্তির আধার হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সরস্বতী দেবীর আরাধনা করেন। প্রতি
বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শ্বেতশুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর
বন্দনা করা হয়। আজ রাত ২টা ৫৮ মিনিটে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি শুরু হয়েছে।
যা আগামীকাল শনিবার রাত ২টা ১৬ মিনিটে তিথি শেষ হবে। গত কয়েক দিন ধরে
প্রস্তুতি চলছে এবং ইতিমধ্যে পূজার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।
রাজধানী
ঢাকায় বিভিন্ন মণ্ডপ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূজার আয়োজন হলেও সরস্বতী
পূজার প্রধানকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মাঠ।
বিস্তীর্ণ এই মাঠজুড়ে সরস্বতী পূজা চমৎকার এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে
পূজা উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি)
শিক্ষার্থীরা। জগন্নাথ হলকে ঘিরে রয়েছে নানা আয়োজন। জগন্নাথ হলে
পূজামণ্ডপগুলের মূল আকর্ষণ চারুকলার শিক্ষার্থীদের নির্মিত দৃষ্টিনন্দন
সরস্বতী প্রতিমা।
বিদ্যাদেবী সরস্বতীর আরাধনার জন্য ঢাবির জগন্নাথ
হল প্রশাসন এবং বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মোট ৭৬টি মণ্ডপে এবার পূজা
উদযাপিত হবে। বৃহস্পতিবার জগন্নাথ হল প্রাধ্যক্ষ দেবাশীষ পাল স্বাক্ষরিত এক
বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বছর জগন্নাথ হল
প্রশাসনের কেন্দ্রীয় পূজাসহ মোট ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন হচ্ছে।
এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এ
পূণ্য আয়োজনে অংশ নিচ্ছে। দুদিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান,
প্রসাদ বিতরণ, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও রক্তদান কর্মসূচি। এ ছাড়া হলের
অভ্যন্তরে দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের চিত্তবিনোদন উপযোগী বেশ কিছু রাইড,
খেলনা ও বিশুদ্ধ খাবারের দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে
আরও বলা হয়, সনাতন ধর্মীয় সব রীতি, আচার, প্রথা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের
প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাশীল হয়ে এ পূজা আয়োজনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে
সম্পন্ন করা হয়েছে। সমগ্র জগন্নাথ হল সিসি ক্যামেরার আওতাধীন থাকবে;
প্রবেশমুখে মেটাল ডিটেক্টরসহ অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে; ছোট
শিশুদের দুগ্ধ সেবনের জন্য বিশেষ নিরাপদ একটি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। সব
ধরনের পটকা বা আতশবাজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া যানবাহন
নিয়ন্ত্রণের জন্য হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ স্টিকার সরবরাহ করা হয়েছে।
এ
ছাড়া ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে দেবীর আরাধনা হবে। সিদ্ধেশ্বরী
মন্দির, শাঁখারী বাজার, তাঁতীবাজার, বনানী, জাতীয় প্রেস ক্লাব ও রমনা
কালীমন্দিরসহ মণ্ডপে মণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়েছে। সব স্থানে
সকালেই পূজার আয়োজন হবে। বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আরতি ও
অন্যান্য অনুষ্ঠান হবে। এ উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন
থাকবে। এ পূজাকে ঘিরে ঢাক-ঢোল-কাঁসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে
বিভিন্ন পূজামণ্ডপ।
এদিকে বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারে
সরস্বতী প্রতিমা বিক্রির ব্যস্ততা দেখা গেছে। সেখানে বিভিন্ন আকৃতির
প্রতিমা নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিমা বানিয়ে
শাঁখারী বাজারে বিক্রি করতে এসেছেন তারা। স্থানীয় অনেক দোকানিও পূজা
উপলক্ষে নিয়মিত ব্যবসার বাইরে প্রতিমা বিক্রি করছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিমা কিনতে ভিড় করছেন, অনেকে আসছেন শুধু প্রতিমা
দেখতে। আকৃতিভেদে প্রতিমার দাম রাখা হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা
পর্যন্ত। তবে ঘরোয়া পূজা হওয়ায় ছোট আকৃতির প্রতিমাগুলোর চাহিদায় বেশি। এ
ছাড়া ফুলসহ পূজা উদযাপনের বিভিন্ন উপকরণও বিকিকিনি চলছে।
সময়ের আলো/এসকে/