সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) আরব বিশ্বের ভেতরে ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি ‘ইহুদিবাদী ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন সৌদি আরবের শূরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ও শিক্ষাবিদ ড. আহমেদ বিন উসমান আল-তুওয়াইজরি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রভাব বাড়ানো এবং অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার কাজে আমিরাত সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এসব কথা বলেন ড. আল-তুওয়াইজরি। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ড. আল-তুওয়াইজরি লেখেন, সৌদি আরব এবং আরব বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগতভাবে কাজ করছে। তার মতে, সৌদি আরবের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধিতা ও ঈর্ষা থেকেই এই সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টাও এর পেছনে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ইসরায়েল ও আমিরাতের এই সম্পর্ক আরব ও মুসলিম ঐক্যের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা। তার ভাষায়, আবুধাবি ‘নিজেকে ইহুদিবাদের হাতে তুলে দিয়েছে’, এই বিশ্বাসে যে এর মাধ্যমে রিয়াদ ও অন্যান্য প্রভাবশালী আরব রাজধানীর প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
প্রবন্ধে এমন বহু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব স্বার্থের ক্ষতি করে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় সমর্থন এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর ওপর হামলা সহজ করতে লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকায় অবস্থিত আমিরাতের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার। ফাঁস হওয়া এক নথির বরাতে বলা হয়, ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ায় থাকা আমিরাতি ঘাঁটিগুলো গাজার বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ইসরায়েলকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।
ড. আল-তুওয়াইজরি আরও বলেন, আমিরাতের এই ভূমিকা শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, তিউনিসিয়া, মিসর ও সোমালিয়ায় আমিরাতের হস্তক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন। তার দাবি, এসব হস্তক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ঐক্য ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন স্থিতিশীলতা প্রচেষ্টা নষ্ট করার অভিযোগ তোলা হয় আমিরাতের বিরুদ্ধে। লিবিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দেওয়া এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সুদানে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সহায়তার মাধ্যমে জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যা বাড়ানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া মিসরের অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাজে লাগিয়ে বন্দর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং ইথিওপিয়ার বিতর্কিত গ্র্যান্ড রেনেসাঁ বাঁধ প্রকল্পে সহায়তার অভিযোগও তোলা হয়েছে আমিরাতের বিরুদ্ধে। ড. আল-তুওয়াইজরির মতে, এসব পদক্ষেপ ইসরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মিসরের পানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
নিবন্ধে ডাচ ট্রান্সন্যাশনাল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একটি ‘উপ-সাম্রাজ্যবাদী’ শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তার দাবি, এই সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ইসরায়েলের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক, বিশেষ করে মিসর ও সৌদি আরবকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে।
মতাদর্শিক দিক থেকে তিনি অভিযোগ করেন, আবুধাবি পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম সমাজ ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দ্য নিউ ইয়র্কারসহ বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে তিনি বলেন, আমিরাত-সমর্থিত সংগঠনগুলো ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় মুসলিম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
তবে এতসব অভিযোগের পরও ড. আল-তুওয়াইজরি আমিরাতের শাসকগোষ্ঠী ও দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন। তিনি সৌদি আরব ও আমিরাতের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের কথা তুলে ধরেন। তার সমালোচনা মূলত আবুধাবির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যাদের তিনি ইহুদিবাদী স্বীকৃতি ও সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণের জন্য আরব ও ইসলামি ঐক্য ত্যাগ করার অভিযোগ করেছেন।
/ইউএমএইচ