আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। আসন্ন ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে কর্মরত বিদেশি কূটনতিকদের তৎপরতা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ইউরোপ-আমেরিকার কূটনীতিকরা বাংলাদেশের কম-বেশি সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে আসন্ন ভোটের চিত্র কেমন হতে পারে তা জানা-বোঝার চেষ্টা করছেন। মূলত বিদেশিরা তাদের বিনিয়োগ স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে এ দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ এবং সহিংসতামুক্ত ভোট অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহী।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানান যে আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় হোটেল ওয়েস্টিনে নির্বাচন কমিশনের সব সদস্য দেশে অবস্থানরত সব বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কমিশনের প্রস্তুতি, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হবে।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠেয় ব্রিফিং অনুষ্ঠানটি গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে অনুষ্ঠান শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এসে ইসি সচিব গণমাধ্যমকে ব্রিফিং করবেন।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপের ২৭টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার গত ২০ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নির্বাচন ইস্যুতে বৈঠক করেন। গত ২২ জানুয়ারি রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া ইইউ রাষ্ট্রদূত এর আগে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশ জানা-বোঝার চেষ্টা করা। ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক নির্বাচন ইস্যুতে গত ১৭ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে ব্রিটিশ হাইকমিশনার একই ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ঢাকায় সদ্য নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন গত ১৯ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নির্বাচন ইস্যুতে বৈঠক করেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত একই ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেছেন।
ঢাকায় অবস্থিত ইইউ কার্যালয় জানিয়েছে, ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান রাষ্ট্রদূত মিলার গত ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা ও ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্র্যাসির সহযোগিতায় পরিচালিত নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি এরপর পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৪
ভোটে তৎপর কূটনীতিকরা
বাংলাদেশের নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয় এ জন্য একটি ব্যাপক সহায়তা প্যাকেজ দিয়েছে, যা নাগরিক সমাজ, প্রশাসন এবং ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পর্যন্ত বিস্তৃত। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে পর্যবেক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর বৈঠকে আলোচনা করা হয়।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে ঢাকায় অবস্থিত ইইউ কার্যালয় জানিয়েছে, ইইউ রাষ্ট্রদূত গত ২০ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সময়ে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশে কর্মরত ইউরোপের আরও সাতজন আবাসিক রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। এই সাক্ষাতে আসন্ন ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া এবং ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারে তাদের সমর্থনের বার্তা দেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ইইউ এই দেশের সংস্কার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশন জানিয়েছে, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক গত ১৭ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের উৎসাহ পুনর্ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া তিনি খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আন্তরিক সমবেদনাও জানান। হাইকমিশন আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট পর্যবেক্ষণের জন্য ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডডোর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে কমনওয়েলথ। কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের দায়িত্ব হলো, নির্বাচনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা এবং নির্বাচন ও গণভোট বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না তার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রদান করা।
এই দলটি বাংলাদেশ যে মানদণ্ডের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে নির্বাচনি প্রক্রিয়া পরিচালনার বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে, যার মধ্যে জাতীয় আইনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মিশন সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যবেক্ষক দলটি কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে নির্বাচনের ফলাফল এবং সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসহ সব কমনওয়েলথ সরকারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ১৪ সদস্যের পর্যবেক্ষক দলের তালিকায় আছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডডো, ক্যারিবিয়ান উইমেন ইন লিডারশিপের প্রেসিডেন্ট লেব্রেচটা নানা ওয়ে হেসে-বেইন, কানাডার যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ নিল ফিলিপ ফোর্ড, প্যাসিফিক ইয়ুথ কাউন্সিলের সমন্বয়ক মিলিয়ানা ইগা রামাতানিভাই, মালয়েশিয়ার সাবেক সিনেটর ড. রাস আদিবা মোহাম্মদ রাদজি, মালদ্বীপের সাবেক উপমন্ত্রী জেফরে সালিম ওয়াহিদ, মরিশাসের নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ইরফান আবদুল রহমান, সিয়েরা লিওনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক ডেভিড জন ফ্রান্সিস, সিঙ্গাপুরের মানবাধিকার আইনজীবী সাঙ্গিথা যোগেন্দ্রন, দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক ম্যান্ডলা এমচুনু, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দিনেশা সামারারত্নে, উগান্ডার অধ্যাপক উইনিফ্রেড মেরি তারিনেবা কিরিয়াবউইরে, যুক্তরাজ্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ রোজমেরি আজায়ি ও জাম্বিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা ক্রিটিকাস প্যাট্রিক এনশিনদানো। ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জানিয়েছে, রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচনের প্রাথমিক পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন শেষে ফেব্রুয়ারির ভোটে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং কমনওয়েলথ (একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা স্বাধীন দেশগুলোর স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সংস্থা)। ইইউ থেকে কম-বেশি ২০০ জন আসন্ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবেন। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং আসন্ন ভোট অনুষ্ঠানে সহযোগিতা সংক্রান্ত ইস্যুতে ইইউ এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গত ১১ জানুয়ারি ইইউ আসন্ন ভোট অনুষ্ঠানে পর্যবেক্ষণ ইস্যুতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করে বিস্তারিত জানিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কমপক্ষে ১০টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক, নির্দলীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার একটি প্রতিনিধি দল গত ২১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে আইআরআই প্রতিনিধি দল ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, আইআরআইয়ের বোর্ড সদস্য এবং প্রতিনিধি দলের প্রধান ক্রিস্টোফার জে ফাসনার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করব। এই পর্যবেক্ষণ ভোট অনুষ্ঠানে সহিংসতা প্রশমিত করতে সহায়তা করবে। সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচন চাচ্ছে। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে আসন্ন নির্বাচনে ইতিবাচক পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বিদেশিরা মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন অনুষ্ঠান এগুলো নিয়ে কথা বলার কারণ হচ্ছে এ দেশে তাদের বিনিয়োগ আছে। তারা চায় না যে তাদের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বিদেশিরা এ জন্য স্থিতিশীলতা চায়। স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত থাকে। এ জন্য তারা গণতান্ত্রিক বা নির্বাচিত সরকারকে পছন্দ করে।