দরিদ্র দেশগুলো কি এখনও বৈশ্বিক চিকিৎসা গবেষণার পরীক্ষাগার? গিনি-বিসাউয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত একটি হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ট্রায়াল স্থগিত হওয়ার পর এই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, আফ্রিকান বিজ্ঞানী ও সাবেক মন্ত্রীরা বলছেন, এই গবেষণা শুধু নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং এটি দরিদ্র দেশকে চিকিৎসা পরীক্ষার গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহারের পুরোনো প্রবণতাকেই আবারও উন্মোচন করেছে।
গিনি-বিসাউয়ের সিদ্ধান্ত ও দ্বন্দ্ব : গিনি-বিসাউয়ের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিতর্কিত হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ট্রায়াল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি কারিগরি ও নৈতিক পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই গবেষণা চালানো যাবে না। কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রায়ালটি আদৌ শুরু হবে কি না তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা আসছিল। শেষ পর্যন্ত সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক থামেনি।
গবেষণা চলবে, বলছে যুক্তরাষ্ট্র : এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) বলছে, গবেষণাটি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। সংস্থাটির মুখপাত্র এমিলি হিলিয়ার্ড জানিয়েছেন, অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে গবেষণার প্রটোকল চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ফলে একদিকে গিনি-বিসাউয়ের স্থগিতাদেশ, অন্যদিকে মার্কিন অর্থদাতাদের ‘চলবে’ বার্তা, এই দ্বন্দ্ব গবেষণার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ট্রায়ালটি কী নিয়ে : এই গবেষণাটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ডেনমার্কের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্কের অধিভুক্ত বানডিম হেলথ প্রজেক্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন থেকে ১৬ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে প্রকল্পটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরু থেকে গিনি-বিসাউয়ের ১৪ হাজার নবজাতককে এলোমেলোভাবে দুদলে ভাগ করা হতো। এক দল জন্মের সময় হেপাটাইটিস বি টিকা পেত, অন্য দল পেত না। অথচ দেশটি ২০২৭ সাল থেকেই জন্মের সময় টিকা দেওয়ার জাতীয় নীতি চালু করতে যাচ্ছে।
কেন আপত্তি বিজ্ঞানীদের : বিরোধীরা বলছেন, এই ট্রায়ালের মূল সমস্যাই হলো নবজাতকদের একটি অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে টিকা না দেওয়া। গিনি-বিসাউয়ে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার প্রায় ১৯ শতাংশ। জন্মের সময় সংক্রমিত হলে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুই আজীবন রোগ বহন করে, যা পরে লিভারের মারাত্মক রোগ ও অকালমৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, নিরাপদ ও জীবনরক্ষাকারী একটি টিকা থাকা সত্ত্বেও শিশুদের তা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই নৈতিক হতে পারে না।
‘আফ্রিকান শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে’ : এই গবেষণার কড়া সমালোচকদের একজন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেয়ি আবিমবোলা। তার অভিযোগ, ট্রায়ালটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে জন্মকালীন টিকার ক্ষতিকর দিক প্রমাণের সম্ভাবনা বাড়ে, বাস্তবে ক্ষতি না থাকলেও। তার ভাষায়, ‘তারা আফ্রিকান শিশুদের ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে টিকা কমানোর যুক্তি দাঁড় করাতে চাইছে।’ উল্লেখযোগ্য যে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশেই হেপাটাইটিস বি টিকার জন্মকালীন ডোজের সুপারিশ বাতিল করেছে।
‘আমরা গিনিপিগ নই’ : গিনি-বিসাউয়ের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাগদা রোবালো এই ট্রায়ালকে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা গ্রহণযোগ্য নয়। গিনি-বিসাউয়ের মানুষ গিনিপিগ নয়।’ তার অভিযোগ, দেশের হেপাটাইটিস বি কর্মসূচি, জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কিংবা টিকাদান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই গবেষণার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এই অবহেলা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
টিকা নিয়ে আস্থার ঝুঁকি : ক্যামেরুনের চিকিৎসক ও গবেষক বোগুমা টিটাঞ্জি সতর্ক করে বলেছেন, এই বিতর্ক শুধু একটি গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দরিদ্র দেশে এমন ট্রায়াল চালানো, যা ধনী দেশে চালানো হতো না, আফ্রিকায় টিকা নিয়ে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। এতে মানুষ মনে করতে পারে, আফ্রিকানদের ওপর গোপন বা ক্ষতিকর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো মহাদেশে টিকাদান কর্মসূচিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ক্ষমতার বৈষম্য ও শেষ প্রশ্ন : এই ঘটনাকে অনেকেই বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। রোবালোর মতে, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণায় ক্ষমতার ভারসাম্য এখনও ধনী দেশগুলোর পক্ষেই ঝুঁকে আছে। তারা মনে করে, দরিদ্র দেশে যা খুশি করা যায়। তার ভাষায়, ‘এই ক্ষমতার কাঠামো ভাঙতে হবে।’ গিনি-বিসাউয়ের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি ট্রায়াল স্থগিত নয়, বরং একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে আফ্রিকার দেশগুলো কি এবার গিনিপিগ হওয়ার ইতিহাস বদলাতে পারবে?