ক্যানসারকে হারিয়ে ঢাবিতে নুহা

ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ

মরণব্যাধি জয় করে এক বিজয়গাথা রচনা করেছেন নুসরাত জাহান নুহা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিটি

2026-01-26T00:46:16+00:00
2026-01-26T00:46:16+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ক্যানসারকে হারিয়ে ঢাবিতে নুহা
ভর্তি পরীক্ষায় দুই ইউনিটে শততম
ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম 
মরণব্যাধি জয় করে এক বিজয়গাথা রচনা করেছেন নুসরাত জাহান নুহা। ছবি : সময়ের আলো
মরণব্যাধি জয় করে এক বিজয়গাথা রচনা করেছেন নুসরাত জাহান নুহা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিটি দিনকে পরাজয় নয়, আশা আর সংগ্রামের দিন বানিয়েছেন। অদম্য মনোবলেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সেশনের ভর্তি পরীক্ষায় বি (কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান) ও সি (ব্যবসায় শিক্ষা) ইউনিটে ১০০তম স্থান অর্জন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগে ৩২তম, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭তম স্থান অধিকার করে তিনি আমাদের শেখালেন যে জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও স্বপ্নের পেছনে চলা থামানো যায় না। 

নুসরাত জাহান নুহার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে যখন তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন তখনই ঝুঁকিপূর্ণ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তখন থেকেই স্বাভাবিক জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে সংগ্রামের। তবু এই সংগ্রামে কখনো হার মানেননি নুহা। 

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে বোর্ডে ১৭তম হয়ে ট্যালেন্টপুলে স্কলারশিপ পায় নুহা। হলিক্রস কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও তিন তলায় ক্লাস হওয়ায় শারীরিক দুর্বলতার কারণে সেখানে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়ে জীবনকে নতুন করে শুরু করেন নুহা। 

নুহার সংগ্রামের কথা জানিয়ে তার বড় ভাই খালিদ মাহমুদ খান বলেন, কেমোথেরাপির সময় নুহার অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ডাক্তার পা কেটে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। মাথার চুল সব পড়ে গিয়েছিল, রক্ত চলাচলের শিরা পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই সময়ে হাসপাতালের মেঝেতে ঘুমিয়ে বড় বোন মণি আপু নুহার সব যত্ন নিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিবারে সাত সদস্য, বাবা বেসরকারি চাকরিজীবী। ঢাকায় চিকিৎসা, বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া সব সামলানো একজনের পক্ষে কঠিন হলেও তিনি তা করেছেন। আজ নুহার শরীরে কোনো ক্যানসারের সেল নেই। ছোট পা হলেও তার মনোবল, ধৈর্য ও পরিবারের ভালোবাসা প্রমাণ করেছে- ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। 

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বর্ণনা দিয়ে নুসরাত জাহান নুহা সময়ের আলোকে বলেন, কেমোথেরাপির সেই দিনগুলোতে জীবন যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। পড়াশোনায় পড়ে যায় ছেদ। আগে যেখানে প্রাইভেটে প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চলত, সেখানে শরীর অসুস্থ হলেও বইয়ের খোঁজটা কখনো ছাড়িনি। তবু মাঝেমধ্যে মন খারাপ হতো- আমি পড়তে পারছি না অথচ বাকিরা এগিয়ে যাচ্ছে। সেই কষ্ট ছিল নীরব, গভীর। কিন্তু কখনোই মনোবল হারাইনি। সুস্থ হওয়ার পর আবার পড়াশোনায় ফিরি। তখনই সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে। জানতে পারি, ব্যাচে গিয়ে নিয়মিত পড়া সম্ভব নয়- পায়ে বেশি ঝাঁকুনি লাগলে সমস্যা হতে পারে। বাসায় সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্যও ছিল না। সদ্য চিকিৎসার পেছনে পরিবারের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বাস্তবতা তখন স্বপ্নের চেয়ে ভারী। তাই নিজেই দায়িত্ব নিই নিজের পড়াশোনার। সমাজ, ধর্মের মতো বিষয়গুলো নিজে পড়েছি। বিজ্ঞান বিষয়গুলো পড়িয়েছেন বড় বোন। এভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে অংশ নিই এসএসসি পরীক্ষায়। ফল আসে জিপিএ ৫। একসময় স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সেই স্বপ্ন আর খাপ খায়নি। তখন নতুন করে ভাবি- ডাক্তার না হতে পারলেও আইনজীবী হব। এটি ছিল বাবার ইচ্ছা। বড় বোনের কথায় হলিক্রস কলেজে পরীক্ষা দিই। কিন্তু ভাইভায় গিয়ে জানতে পারি, আর্টস বিভাগের ক্লাস তিন তলায়। আবারও একবার স্বপ্ন ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হই পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে। সাহস করে ব্যাচে পড়া শুরু করি। শীতের সময় প্রচণ্ড পা ব্যথা করত, তবু সকালে প্রাইভেট পড়তে যেতাম। এই কষ্টগুলোকে কখনোই আলাদা করে গুরুত্ব দিইনি। সামনে তাকিয়েছি শুধু লক্ষ্যের দিকে। 

নুহা বলেন, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনলাইনে কোচিং শুরু করি। প্রথমদিকে মনে হতো, যারা অফলাইনে পড়ছে তারা হয়তো বেশি সুবিধা পাচ্ছে, বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে আছে। তবু যতটা সম্ভব পরিশ্রম করেছি- বরং আরও বেশি। সেই পরিশ্রমই আল্লাহ কবুল করেছেন। ভর্তি পরীক্ষায় আমি ১০০তম স্থান অর্জন করি। তিনি বলেন, এই পথচলায় পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের প্রতি আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। কঠিন সময়ে তারা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা আজীবন মনে থাকবে। বিশেষ করে বড় বোন মনি আপু এবং আমার বান্ধবী রাদিয়া তাদের অবদান ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। 

সবশেষে নুহা সময়ের আলোকে বলেন, এখন ইচ্ছা একটাই- এমন কিছু করা, যাতে দেশ ও মানুষের সেবা করা যায়। আমার গল্প থেকে যদি কেউ অনুপ্রেরণা পায় সেটিই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। আর যারা আমার জন্য দোয়া করেছেন তাদের প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   ক্যানসার  ঢাবিতে নুহা  ভর্তি পরীক্ষা  দুই ইউনিট  শততম 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: