আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিতে দেশব্যাপী প্রচার চালাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টা এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সব মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও অধীন সংস্থাগুলো প্রচার কাজে সম্পৃক্ত।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ জন উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী দেশব্যাপী সফর করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোটারদের কাছে নানা যুক্তি তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে নতুন সরকারকে বরণের প্রস্তুতিও চলছে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সহ বিভিন্ন দফতরে। উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তারা গণভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় গত কয়েক দিন থেকে প্রশাসনে দাফতরিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তারা বলেন, প্রশাসনের সবাই নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে। এ কারণে রুটিন কাজের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হচ্ছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা।
গত ১৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় গণভোট নিয়ে উপদেষ্টাদের প্রচার। গণভোটের প্রচারের জন্য দেশব্যাপী সফর করা উপদেষ্টারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের গঠন করা নির্বাচন মনিটরিং এবং সহায়তা প্রদানকারী উপদেষ্টা কমিটির সদস্য। প্রচারণার অংশ হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় এবং গণভোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তারা গণভোটের গুরুত্ব, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করছেন। উপদেষ্টারা জেলা প্রশাসনসহ সরকারি বিভিন্ন দফতরের গণভোট নিয়ে প্রচার কার্যক্রম উদ্বোধনও করেছেন।
স্থানীয় সরকার, শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, আইন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, তথ্য ও সম্প্রচার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, খাদ্য এবং ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়া) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গণভোটের প্রচারে বিভিন্ন জেলায় নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে আসন্ন গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি হ্যাঁ ভোটের প্রচার চালাতে উপদেষ্টাদের পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ব্যস্ত রয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সব দফতর, অধিদফতর, পরিদফতর, সংস্থা, করপোরেশন এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই প্রচারে অংশ নিচ্ছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পদ প্রায় ১৯ লাখ ১৯ হাজার। এর মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রচার চালাচ্ছেন। সরকারের সচিব থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী পর্যন্ত সবাই গণভোটের সচেতনতামূলক প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সারা দেশে প্রচারের বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য ৩১টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের সমন্বয়ে এসব টিম সারা দেশের জেলা পর্যায়ের প্রচার ঠিকভাবে চলছে কি না তা মনিটরিং করছে।
প্রতিটি টিম জনসচেতনতা বাড়াতে অন্তত দুটি জেলায় প্রচারে ব্যানার, লিফলেট, টিভিসি, আঞ্চলিক গানসহ অন্য যেসব উদ্যোগ ঠিকভাবে নেওয়া ও কার্যকর করা হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করছে। সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের প্রধান কার্যালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ইতিমধ্যে গণভোটবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনলাইনে যুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সঙ্গে সমন্বয় করে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে। একটি সাদা, অন্যটি গোলাপি। সাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যাবে। গোলাপি রঙের ব্যালটে জুলাই সনদের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিতে হবে। বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার চালানো হচ্ছে।
সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি রয়েছে। উপদেষ্টারা গণভোট নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম অনেকটা ঢিমেতালে চলছে। রুটিন কাজের বাইরে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও আগ্রহী হচ্ছেন না শীর্ষ কর্মকর্তারা। সবাই নির্বাচিত নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য গণভোট জরুরি। সে কারণেই গণভোটে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রত্যাশা করছে। দলমত-নির্বিশেষে এবং প্রশাসনের সবাইকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে।
তিনি বলেন, গণভোটের বিপক্ষে একমাত্র তারাই দাঁড়াতে পারে, যারা পরাজিত শক্তি এবং ফ্যাসিবাদের সহযোগী। যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী ও গণমানুষের প্রতিপক্ষ, তারাই ভিন্ন চিন্তা করতে পারে। ফ্যাসিবাদকে কখনো ফিরে আসতে দেওয়া যাবে না। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিকল্প নেই।’
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়বদ্ধতা থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন জেলা সফর করেছেন। এ দেশে একবার কেউ ক্ষমতায় যেতে পারলে ছলেবলে কৌশলে, প্রহসনের নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে এরূপ হীন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে। রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটবে।
তিনি বলেন, একটি মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে না। কেউ বিভ্রান্ত হবেন না, এগুলো সব মিথ্যা প্রচার। তিনি সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর অনুরোধ জানান।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য ১২ ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দিতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কেন থাকতে হবে তা সাধারণ মানুষকে বোঝানো হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলে রাষ্ট্র তার হবে। জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে এবং স্বাধীন বিচার ও নির্বাচনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কার অপরিহার্য। কেউ আর বছরের পর বছর মানুষ হত্যা করে, মানুষকে দমন করে, কথা বলতে না দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করে ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।
এফআর