ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় শেষ জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করার পর মিসরের সঙ্গে গাজার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং সীমিতভাবে পুনরায় খুলতে দেবে বলে সোমবার জানিয়েছে ইসরাইল।
গাজায় ত্রাণ প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার রাফাহ পুনরায় খোলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কাঠামোর অংশ। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এই ক্রসিং বন্ধ রয়েছে। সপ্তাহান্তে জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সফররত মার্কিন দূতরা রাফাহ পুনরায় খোলার জন্য ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
জেরুজালেম থেকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের বরাত দিয়ে এএফপি সোমবার জানায়, পূর্ণ ইসরাইলি তল্লাশি ব্যবস্থার আওতায় কেবল পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য রাফাহ পুনরায় খোলার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে ইসরাইল।
কার্যালয়ের এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে সব জীবিত জিম্মিকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিহত সব জিম্মির অবস্থান শনাক্ত ও ফেরত দিতে হামাসের শতভাগ প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, শেষ জিম্মি রান গিভিলির মরদেহ উদ্ধারের লক্ষ্যে তারা রোববার গাজা উপত্যকার একটি কবরস্থানে তল্লাশি চালিয়েছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, এই অভিযান সম্পন্ন হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যা সম্মত হয়েছে তার আলোকে ইসরাইল রাফাহ ক্রসিং খুলে দেবে।
ইয়েলো লাইন তথা হলুদ রেখায় সীমাবদ্ধ গাজার জীবন : ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সর্বশেষ পুনঃমোতায়েনের সীমা চিহ্নিত করা হলুদ রঙের কংক্রিট ব্লক থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে, চার সন্তানের জনক বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি জায়েদ মোহাম্মদ তার পরিবার নিয়ে একটি ছোট্ট তাবুতে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই তথাকথিত ‘হলুদ লাইন’ হলো সেই সীমারেখা, যেখানে অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ অনুযায়ী ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী, এই রেখা গাজার পূর্ব সীমান্ত থেকে ভেতরে ১.৫ থেকে ৬.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পুরো উপত্যকার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে।
এই হলুদ রেখা গাজাকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করেছে। পূর্বাঞ্চল পুরোপুরি ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে, আর পশ্চিমাঞ্চলে ফিলিস্তিনিরা তুলনামূলকভাবে কম বিধিনিষেধে চলাফেরা করতে পারলেও সারাক্ষণই বিমান হামলা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে। জায়েদের তাঁবুটি দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপে পরিণত এক শহরের মধ্যে ভেঙে পড়া বাড়ি, সমতল হয়ে যাওয়া রাস্তা আর যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে থাকা ইট-পাথরের স্তূপ।
জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় জমে থাকা ৬ কোটির বেশি টন ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে সাত বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
ইসরাইলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চালানো এই যুদ্ধ গাজার ২৩ লাখ মানুষের বসবাস করা এলাকার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে জায়েদের মতো অধিকাংশ মানুষ এখন তাঁবু কিংবা বোমায় বিধ্বস্ত ঘরেই ঠাঁই নিতে বাধ্য।
‘চব্বিশ ঘণ্টাই গোলাগুলি আর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়,’ আলজাজিরাকে বলেন জায়েদ, পূর্ব দিগন্তের দিকে ইশারা করে, যেখানে মাঝেমধ্যে ধুলোর মেঘ উঠতে দেখা যায়। তিনি কথা বলার সময় আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন ভেসে আসছিল, আর হলুদ ব্যারিকেডের কাছে ট্যাঙ্ক অবস্থান নিয়েছিল। ‘ইসরাইলি সেনারা এখান থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে,’ তিনি বলেন। ‘অনেক সময় আমরা বুলডোজারের শব্দ শুনি— ঘর ভাঙা হচ্ছে, ক্ষেত সমতল করা হচ্ছে। এই সীমার একটু বাইরে গেলেই জীবন ঝুঁকির মুখে।’
হলুদ লাইনের কাছাকাছি থাকা মানুষরা জানান, তাদের প্রায়ই গুলির শব্দ বা ছোট বিস্ফোরণে ঘুম ভাঙে। ‘রাতে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকে, বিদ্যুৎ নেই,’ যোগ করেন জায়েদ। ‘তবে সেনারা আকাশে ফ্লেয়ার ছোড়ে, যা মুহূর্তের জন্য চারপাশ আলোকিত করে তোলে।’
নতুন এক সীমান্ত : হলুদ লাইন বলতে গাজার ভেতরে ইসরাইল ঘোষিত সামরিক এলাকা ও বাফার জোনগুলোকেই বোঝায়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থার মতে, যুদ্ধ চলাকালে এসব এলাকা বারবার বদলেছে— কখনো বড় হয়েছে, কখনো সরে গেছে। এর ফলে গাজার ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সীমান্ত তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচল, জীবিকা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
ডিসেম্বরে গাজা সফরের সময় ইসরাইলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই হলুদ লাইনই এখন ‘নতুন সীমান্ত’।
এর ফলে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা, যার মধ্যে দক্ষিণের রাফাহ ও উত্তরের বেইত হানুনও রয়েছে, কার্যত ইসরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই রেখার জন্ম হয়েছে যুদ্ধজুড়ে দেওয়া অসংখ্য জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নির্দেশনার মধ্য দিয়ে। কখনো লিফলেট, কখনো ফোন বার্তা, কখনো অনলাইন মানচিত্রে জানানো হতো— অনেক সময়ই তখন আকাশে বোমা পড়ছিল। ফলে মানুষের হাতে নিরাপদে সরে যাওয়ার সময় থাকত না।
জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দফতরের হিসাব বলছে, বিভিন্ন সময়ে গাজার ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ‘পরিত্যাগের নির্দেশ’ বা ‘অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। গাজার মানুষের কাছে এই হলুদ লাইন মানে ভেতরের পরিবর্তনশীল সামরিক সীমানা। মানচিত্রে হয়তো আসে-যায়, কিন্তু বাস্তবে এটি সবসময়ই উপস্থিত। কোন গলি নিরাপদ, কোন ঘর ছেড়ে যেতে হবে, কখন দৌড়াতে হবে— এই অদৃশ্য রেখাই তা ঠিক করে দেয়।
অনেক জায়গায় এর কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নেই। নেই বোর্ড, নেই দেয়ালে লেখা কিছু। মানুষকে ভরসা করতে হয় নিজের অভিজ্ঞতা, শব্দ আর স্মৃতির ওপর। যে এলাকা গতকাল নিরাপদ ছিল, আজ রাতেই তা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।পরিবারগুলো তড়িঘড়ি করে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেয়, এমন ঘরও ছেড়ে যায় যেগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আর নিরাপদ মনে হয় না। এখানে প্রায় সবাই অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে— অনেকেই বহুবার।
এইভাবে বেঁচে থাকা মানুষের ওপর গভীর মানসিক চাপ তৈরি করে। বাবা-মায়েরা দেখেন, তাদের সন্তানরা নতুন নিয়ম শিখছে— কোন রাস্তা এড়িয়ে চলতে হবে, কোথায় লুকোতে হবে, আকাশে শব্দ বাড়লে কী করতে হবে। সাহায্যকর্মীরা বলেন, এই স্থায়ী অনিশ্চয়তা ভয়, ক্লান্তি আর গভীর ট্রমা তৈরি করছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে হুমকির মধ্যে থাকার কারণে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক আঘাত ভয়াবহভাবে বেড়েছে। শিশুরা নিজেরাই এক ধরনের নতুন ‘নিরাপত্তার মানচিত্র’ তৈরি করেছে কোন রাস্তা নিষিদ্ধ, গোলাবর্ষণ শুরু হলে কোন দিকে দৌড়াতে হবে। সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, এভাবে বিপদকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, বিশেষ করে যারা সামরিক এলাকার কাছে বাস করছে।
হলুদ লাইন শুধু নিরাপত্তাই নয়, জীবিকার পথও আটকে দিচ্ছে। কৃষকরা দূর থেকে নিজের জমি দেখতে পান, কিন্তু সেখানে যেতে পারেন না। কর্মস্থল অনিরাপদ এলাকায় পড়লে চাকরি হারিয়ে যায়। বোমাবর্ষণ কমলেও ভয় মানুষকে ঘরে ফিরতে দেয় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সামরিক তৎপরতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নষ্ট হয়ে গেছে।
শান্ত মুহূর্তেও এই হলুদ রেখা মিলিয়ে যায় না। মানুষ কোথায় থাকবে, কীভাবে চলবে, আদৌ ঘর নতুন করে তুলবে কি নাÑ সবকিছুই এই অদৃশ্য সীমারেখাই নির্ধারণ করে দেয়। মাটিতে আঁকা না হলেও মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে গভীরভাবে লেখা হয়ে আছে এই হলুদ লাইন।
এফআর