অ্যান্টার্কটিকার বিশাল টটেন আইস শেলফের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন বিজ্ঞানী বেন গ্যালটন-ফেঞ্জি। তার সামনে সূর্য, পেছনে পূর্ণিমার চাঁদ। চারপাশে কেবল সাদা আর নীরবতা। তবে তার উদ্বেগ বরফের ওপরে নয়; বরং প্রায় দুই কিলোমিটার নিচে, যেখানে অন্ধকার সমুদ্রের পানি ধীরে ধীরে গলিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফভান্ডার। সেই গলনের গতি নির্ভর করছে বিশ্বের উপকূলগুলো টিকে থাকবে, না ডুবে যাবে।
অ্যান্টার্কটিকায় ৭০টির বেশি আইস শেলফ রয়েছে, যা মূল ভূখণ্ডের বরফকে সমুদ্রের ওপর ভাসিয়ে ধরে রেখেছে। এগুলো নিজেরা গলে গেলেও সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় না। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন উষ্ণ সমুদ্রের পানি নিচ থেকে এই বরফগুলোকে দুর্বল করে দেয়। তখন বিশাল বরফচাদর দ্রুতগতিতে সমুদ্রে ধেয়ে যায় আর বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেই এত বরফ আছে, যা পুরোপুরি গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বেন গ্যালটন-ফেঞ্জির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক গবেষকরা সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে গলনের হার নিয়ে ৯টি বৈজ্ঞানিক মডেল একত্র করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রতি বছর বরফের নিচ থেকে প্রায় ৮৪৩ বিলিয়ন টন বরফ গলে যাচ্ছে। এই পরিমাণটা কল্পনা করতে হলে ভাবতে হয়: এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতার ৮৪৩টি বিশাল বরফঘনক একসঙ্গে গলে যাচ্ছে। এটি প্রায় নীল নদের বার্ষিক পানিপ্রবাহের সমান।
সমস্যা হলো, এই গলন প্রক্রিয়াটি আমরা ঠিকমতো দেখতে পারি না। অ্যান্টার্কটিকার আইস শেলফের নিচে পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা সমুদ্রের পানি প্রবাহিত হয়, যেখানে আলো পৌঁছায় না। উপগ্রহ সেখানে ঢুকতে পারে না, জাহাজ পৌঁছতে পারে না, আর বরফে গর্ত করাও বিপজ্জনক। হাতে গোনা কয়েকটি জায়গা থেকে পাওয়া তথ্য দিয়েই বিজ্ঞানীরা পুরো মহাদেশের ভবিষ্যৎ বোঝার চেষ্টা করছেন।
কখনো কখনো প্রযুক্তি হঠাৎ করে নতুন জানালা খুলে দেয়। অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী স্টিভ রিনটুলের দল একটি ভাসমান স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পাঠিয়েছিল টটেন আইস শেলফের নিচে। সেটি সরে গিয়ে অন্য দুই শেলফের নিচে ৯ মাস তথ্য পাঠায়। সেই তথ্য দেখায়, ডেনম্যান আইস শেলফের নিচে তুলনামূলক উষ্ণ পানি ঢুকছে, যা একবার একটি সীমা পার করলে আর থামানো যাবে না। ওই একটি অঞ্চলেই এত বরফ আছে, যা গলে গেলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ ১.৫ মিটার বাড়তে পারে।
অ্যান্টার্কটিকার ইতিহাসেও বিপদের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। প্রাচীন যুগে বরফ এগোতে এগোতে সমুদ্রতলে বিশাল খাত কেটে দিয়েছে। এখন সেই খাত দিয়েই উষ্ণ পানি ঢুকে বরফ গলাচ্ছে; নিজেদের ধ্বংসের পথ নিজেরাই তৈরি করেছে বরফচাদর। বিজ্ঞানীরা জানেন, বরফ গলবে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন শুধু একটাই : কত দ্রুত?
এই অনিশ্চয়তা শুধু উপকূল ডোবার ঝুঁকিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরফ গলার ফলে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সমুদ্রের বড় বড় স্রোতব্যবস্থাকে ধীর করে দিতে পারে। এই ‘ওশান কনভেয়ার বেল্ট’ই পৃথিবীর জলবায়ুকে স্থিতিশীল রাখে। সেটি ভেঙে পড়লে আবহাওয়া, কৃষি ও জীবনব্যবস্থায় প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটতে শতাব্দী লাগতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টা এখনই। আমরা কতটা গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়ছি, সেটিই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যতের মানচিত্র। অ্যান্টার্কটিকার বরফ একবার অস্থিতিশীল হয়ে গেলে আর ফেরানো যাবে না। বোতল থেকে জিন বেরিয়ে গেলে যেমন তাকে আর ঢোকানো যায় না; ঠিক তেমনই।
এফআর