ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ। সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুইজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই সামরিক মোতায়েনকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন ও সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবেলায় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানান, নিমিৎজ-শ্রেণির পারমাণবিক চালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে একাধিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এসব যুদ্ধজাহাজ বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীন জলসীমায় অবস্থান করছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের উপকূলবর্তী এলাকায় মোতায়েন হতে পারে।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমরা একটি আর্মাডা (বৃহৎ যুদ্ধজাহাজের বহর) ইরানের দিকে পাঠিয়েছি। যদি প্রয়োজন পড়ে, আমি বলছি না যে কিছু ঘটতে যাচ্ছে, হয়তো এই বহর আমাদের ব্যবহারই করতে হবে না। তবে আমরা ইরানকে নিবিড় নজরদারিতে রাখছি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো শুধু আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিও জোরদার করবে। অন্য এক কর্মকর্তা জানান, অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই আগাম সতর্কতা হিসেবে এই বহরে আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া এই যুদ্ধজাহাজ বহরে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিস্ফোরক মজুত রাখা হয়েছে। পেন্টাগন একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পাঠাচ্ছে বলে জানিয়েছে। গত সপ্তাহান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয়, তারা এই অঞ্চলে একটি মহড়া পরিচালনা করবে, যার উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ বিমানশক্তি দ্রুত মোতায়েন, ছড়িয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন।
চলতি জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে এই যুদ্ধজাহাজ বহর ইরানের উদ্দেশে রওনা হয়। সে সময় ইরানজুড়ে তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। ওই বিক্ষোভ দমনে ইরানি সরকারের কঠোর অবস্থানের জেরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেই তিক্ততা আরও গভীর হয়। গত বছর জুন মাসে এ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতও ঘটে।
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করলে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি বিক্ষোভ দমনে নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়, তাহলে দেশটিতে আবারও সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সে ধরনের কোনো অভিযান না হলেও, তার পরিবর্তে বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ বহর মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
এদিকে, ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক হামলাকে তেহরান ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক সামরিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভিযান না চালালেও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল যুদ্ধজাহাজ বহর মোতায়েন ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
/ইউএমএইচ