ইরানের ‘উচ্চ পর্যায়ের’ কয়েকজন কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ব্যক্তিকে ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হতাহতের জন্য দায়ী করছে ট্রাম্প প্রশাসন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-কে এমনটাই জানিয়েছেন এ সম্পর্কে অবগত এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা। এ হামলা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে। যদিও সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে বলে সোমবার মিডল ইস্ট আই-কে (এমইই) জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের ভেতরের আলোচনা ‘বিশৃঙ্খল’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। মূল বিতর্ক হচ্ছে ইরান কীভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় এক মাস ধরে ইরানে হামলার কথা ভাবছে। কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কঠোর দমন-পীড়ন, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের এক সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘দখল করে নিতে’ আহ্বান জানালেও পরে অবস্থান নরম করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘হত্যা বন্ধ হয়ে গেছে।’ এই উত্তেজনা প্রশমনের সিদ্ধান্ত আসে মূলত সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের চাপের মুখে, যারা হামলার বিরুদ্ধে জোরালো লবিং করেছিল।
কিছু প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতি হিসেবে দেখা হলেও, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা এমইই-কে বলেন, এটি আসলে সাময়িক বিরতি মাত্র। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একইভাবে উত্তেজনা বাড়ানো-কমানোর কৌশল নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেখানে হামলার নির্দেশ দেন, যার পর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে আটক করা হয়। এক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এমইই-কে জানান, প্রশাসনের ভেতরের আলোচনায় এখনও ‘তেহরানে সরকার পরিবর্তনের’ চিন্তা পুরোপুরি বাদ যায়নি। স্টিমসন সেন্টারের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির প্রধান র্যান্ডা সিøমও আগে বলেছিলেন, ট্রাম্পের এই শান্ত অবস্থান ‘স্থায়ী নয়’।
জানুয়ারির শুরু থেকে এখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আগের চেয়ে অনেক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে এবং এখন ‘মোট সরবরাহ’ বেড়েছে। যদিও ইউক্রেনে সহায়তা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সীমাবদ্ধতার মুখে। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। সামরিক সমাবেশ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বিমানবাহী রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এতে রয়েছে এফ-৩৫, এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত ইএ-১৮জি গ্রাউলার। ডাভোস থেকে ফেরার পথে ট্রাম্প বলেন, ইরানের দিকে বড় শক্তি যাচ্ছে। আমি চাই না কিছু হোক, কিন্তু আমরা খুব কাছ থেকে তাদের দেখছি। ফ্লাইট ট্র্যাকার বলছে, জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েন করেছে।
এই মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প দিচ্ছে, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি। এপ্রিল ২০২৫ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। রয়টার্সের বরাতে এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরব দেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহার করে, তবে সেসব দেশও হামলার লক্ষ্য হবে। তেহরানঘেঁষা বিশ্লেষকরাও প্রকাশ্যে একই হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। সৌদি আরব, ওমান, কাতার ও তুরস্ক হামলার বিরোধিতা করছে। ইসরাইলি গণমাধ্যম বলছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান হামলার পক্ষে।
আমিরাতের আল-নাহিয়ান শাসক পরিবার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং ইরানে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে থাকা ইসরাইলের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠতা দেখাতে সতর্ক। তবে আবুধাবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা অন্য সূত্র বলছে, আমিরাতও সামরিক হামলার বিরোধী। সোমবার আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক কাজে ব্যবহার করতে দেবে না।
এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে পাল্টা হিসেবে ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে আঘাত হানে। যদিও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ইরান অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখবে। সে ক্ষেত্রে তারা অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে বা বিশ্ব তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হওয়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরান-ইসরাইল ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আকাশে আধিপত্য বিস্তার করলেও তেহরান তেল আবিব ও হাইফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা আঘাত হানে। বেশিরভাগ প্রতিহত হলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদ করে। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জামের সংকটে পড়ে এবং সৌদি আরবকে তাদের কেনা থাড সিস্টেম ছাড়তে অনুরোধ করে, যা রিয়াদ প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন অঞ্চলে আরও প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাচ্ছে।
সময়ের আলো/এসকে/