কৃষকরাই জাতির মেরুদণ্ড এই কথা আমরা মুখে বললেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। দাম না পেয়ে অনেক সময় কৃষকরা ফসল ফেলে দিতে বাধ্য হন। তখন আমরা কয়েকদিন হাহুতাশ করি। কিন্তু কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে প্রণোদনা দিতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত একটি জাতীয় কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, শিল্প-কারখানার মালিকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলেও দুই শতাংশ সুদে ঋণ মওকুফ পেয়ে যান। অথচ কৃষকরা ঋণ পেতেই হিমশিম খান। শিল্পখাতে নানাভাবে প্রণোদনা দেওয়া হলেও কৃষকদের প্রণোদনার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এ ধরনের অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকরা টিকে থাকতে পারবে না। আর কৃষকদের উন্নতি না হলে দেশের উন্নয়নও সম্ভব নয়। তাই কৃষির উন্নয়ন করতে হলে কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে।
সকালে ‘ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার : আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে কৃষি মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব ড. মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) ঢাকাস্থ প্রতিনিধি ড. জিকুইন শি, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমান এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব কামরুল হাসান।
কৃষি উপদেষ্টা বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। তখন কৃষিজমি ছিল বেশি, কিন্তু উৎপাদন ছিল কম। বর্তমানে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে, কৃষিজমি কমছে, অথচ উৎপাদন বেড়েছে। তবুও কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। দাম না পেয়ে তারা ফসল ফেলে দেন। তখন গণমাধ্যমে কিছু প্রতিবেদন হয়, আমরা সাধারণ মানুষ কিছুদিন হাহুতাশ করি—এরপর সব আগের মতোই থাকে।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই ভাবছেন কৃষক উৎপাদন না করলে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা যাবে। কিন্তু শুধু টাকা থাকলেই সব সময় পণ্য পাওয়া যায় না। তাই নিজেদের উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
আউটলুক ২০৫০ প্রসঙ্গে
লে. জে. মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা দেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি। আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশের কৃষির রূপান্তর জীবনের মানোন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন শুধু কৃষি খাত নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কেন ‘বাংলাদেশের কৃষির রূপান্তর: দৃষ্টিপথ ২০৫০’
আউটলুকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি হিসেবে কৃষি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ জীবিকা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ঘাটতির অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে প্রধান খাদ্যশস্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
যদিও কাঠামোগত অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে জিডিপি ও কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ধীরে ধীরে কমছে, তবুও জাতীয় স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এই খাত এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদ সংকট, জনমিতিক চাপ, খাদ্য চাহিদার পরিবর্তন এবং বাজার অস্থিরতা কৃষিখাতে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এসব বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও ভবিষ্যতমুখী কৃষি কৌশলের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
২৫ বছরে কৃষিখাতের রূপান্তরের দিকনির্দেশনা
আউটলুক ২০৫০ একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো, যা আগামী ২৫ বছরে কৃষিখাতের রূপান্তরের দিকনির্দেশনা দেবে। এটি বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই, সহনশীল, লাভজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে পুনর্গঠনের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ। এখানে উৎপাদনশীলতা, পুষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা, ভ্যালু চেইন, বাজার, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বকে একসূত্রে যুক্ত করা হয়েছে।
আউটলুকের মূল ধারণা হলো কাঠামোগত রূপান্তর একটি অধিক উপকরণনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা থেকে আধুনিক, বাজারমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থায় উত্তরণ।
আউটলুক ২০৫০-এর কাঠামো
আউটলুক ২০৫০ মোট সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। এতে প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য, কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ১৩টি বিষয়ভিত্তিক গবেষণা, বাস্তবায়ন কাঠামো, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জীবন্ত দলিল আউটলুক ২০৫০
সবশেষে, আউটলুক ২০৫০-কে একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা যাবে। এটি বাংলাদেশকে একটি খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল এবং সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
/ইউএমএইচ