অভিজাত আর ভাসমানের মিশেল বলে পরিচিত ঢাকা-১৭ আসন। গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন, মহাখালী, শাহজাদপুর এবং ঢাকা সেনানিবাসের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসন। প্রত্যেকবারই আসনটিতে বিভিন্ন দলের হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেষ মুহূর্তে নিজেই প্রার্থী হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। ডা. স. ম. খালিদুজ্জামানকে আগেভাগেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ডা. তাসনুভা জাবিনকে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি নিজেই দল থেকে পদত্যাগ করেন। সেই সঙ্গে পরিচিত এই নেত্রী ভোট না করার সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়া এই আসনে আরও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই হবে তারেক রহমান ও খালিদুজ্জামানের সঙ্গে।
ইতিমধ্যে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত শিবির কথার উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তবে ঢাকা-১৭ আসনের ভোটারদের ভাষ্য, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াপুত্র তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেই কারণে তারা বিএনপি চেয়ারম্যানকে এগিয়ে রাখছেন ভোটের মাঠে। খালিদুজ্জামানের সমর্থকরাও লড়াইয়ে সমানে সমানে থাকতে চান।
জানা গেছে, ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার ৩,২৩,৯৩২। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৭০,৭৮৩ ও নারী ভোটার ১,৫৩,১৪৪। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ৫ জন। এই আসনে কড়াইল বস্তিতে ভোটার প্রায় ৪৫ হাজার। এ ছাড়া সাততলা বস্তি ও ভাসানটেক বস্তিতে আরও কয়েক হাজার ভোট রয়েছে। এ জন্য এই আসনে এলিট শ্রেণি ও বস্তিবাসীর ভোট ঘিরে চলছে নানা সমীকরণ। এই ভোটাররাই হবেন প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের ট্রামকার্ড। এ জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বস্তির ভোটারদের কদর বেড়েছে। চায়ের দোকানগুলোতে জমে উঠেছে নির্বাচনি আড্ডা। ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন প্রার্থীরা। তারা বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
মহাখালী এলাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করেন সফুরা খাতুন। থাকেন কড়াইল বস্তিতে। তিনি বলেন, আমাদের যারা স্থায়ী বাসা করে দেবে, থাকার জায়গা দেবে তাকেই ভোট দেব। বস্তিবাসীর খোঁজ কেউ নেয় না।
তিনি জানান, তাদের বস্তিতে পানি গ্যাস টয়লেটসহ নানা সমস্যা রয়েছে।
কালাচাঁদপুর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মলি আহসান বলেন, আমরা চাই এই এলাকার কোনো আদি বাসিন্দা নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে আসুন। তিনি জানান, পরিবেশ অনুকূলে থাকলে তারা ভোট দিতে যেতে চান। তাই সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ চান।
সাততলা বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক হুমায়ুন মিয়া বলেন, শুনেছি তারেক রহমান এখান থেকে ভোট করবেন। তিনি নির্বাচিত হলে ভালোই হবে। কারণ খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় বাংলাদেশের আগামীর প্রধানমন্ত্রী তো তিনিই হবেন। তাকে ভোট দেব।
আর মহাখালীর ব্যবসায়ী সাইফুল হক বলেন, যারা চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পারবে তাকেই আমরা ভোট দেব। এই এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাদকের সমস্যা সর্বাগ্রে।
প্রতিবারই দেখা গেছে ভোট নিয়ে এই আসনের ভোটারদের আগ্রহ কম থাকে। ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে এখানে ভোট পড়েছিল ১১ শতাংশের মতো। আবদুল মুন্না নামে ক্যান্টনমেন্টের এক বাসিন্দা জানান, এখানকার ভোটাররা বেশিরভাগ অফিসার। অনেকে ঢাকার বাইরে কর্মরত। তাই নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ কিছুটা কম।
প্রথমে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দেন তরুণ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি নিজের দলের প্রতীক গরুর গাড়ি মার্কা নিয়ে প্রচারও শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দলের কান্ডারি তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বদলে যায় সব সমীকরণ। এখানে এখন বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান নিজে। এ খবরে ভোটের মাঠের দৃশ্যপট প্রায় পাল্টে গেছে। সরকার গঠন করতে পারলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন তারেক রহমান, এমন নেতা এখানে নির্বাচন করছেন— এ খবরে নড়েচড়ে বসেছেন এলাকার ভোটাররাও।
এদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামানকে ঘিরে বিজয়ের স্বপ্ন দেখছে জামায়াত। যদিও এই আসনে জামায়াতের তেমন কোনো ভোটব্যাংক নেই। তবে সমর্থকগোষ্ঠী আছে। তারা দিন-রাত কাজ করছেন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে। প্রার্থী নিজেও অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন। প্রচারের পিকআপ ভ্যান গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন বিভিন্ন স্থানে। একই সঙ্গে নানাভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। এখন পর্যন্ত যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে সমানতালে লড়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন জামায়াতের প্রার্থী।
ডা. খালিদুজ্জমান সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হলেও কোনো চিন্তা নেই। তার সঙ্গে সাধারণ ভোটাররা রয়েছেন। এই এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। নির্বাচিত হলে বস্তিবাসীর জন্য আবাসন সমস্যা দূর করাসহ চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত মানবিক গুলশান বনানী গড়ে তুলতে চান।
অভিজাত আসনটিতে তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় বেশ উচ্ছ্বসিত এখানকার বিএনপি নেতাকর্মীরা। রাত-দিন এক করে দলের চেয়ারম্যানের হয়ে ভোটের মাঠে কাজ করছেন তারা। সময়ে সময়ে বৈঠক করে তারেক রহমানও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তাদের। এ ছাড়া এখানেই চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয় হওয়ায় প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো কর্মী-সমর্থক। তাদের প্রত্যাশা— এবার ঢাকা-১৭ আসনে অন্তত ৯০ শতাংশ ভোট নিয়ে জিতবেন তারেক রহমান।
এরই মধ্যে এ আসনে ভাসানটেকে একটি নির্বাচনি জনসভা করেছেন। বস্তিবাসীর পুনর্বাসনসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বানানো হয়েছে দলটির সিনিয়র নেতা আবদুস সালামকে। তার নেতৃত্বে সব থানা-ওয়ার্ডে নির্বাচনি ক্যাম্প পরিচালনা করছে দলটি।
আবদুস সালাম বলেন, এবারের নির্বাচনে তারেক রহমান বিপুল ভোটে জিতবেন। তিনি এই আসনে প্রার্থী হওয়ায় মানুষের ভাগ্য বদলাবে। ঢাকা-১৭ নিয়ে এক গাদা পরিকল্পনা আছে তারেক রহমানের। আমরা ভোটারদের মাঝে সেগুলো পৌঁছে দিয়ে রোজ ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি।
বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া আরও কয়েকজন এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন। তবে তাদের কারও বিষয়ে সাধারণের মধ্যে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা নেই।
আসনটিতে প্রথমে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়ে পরে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হয়েছেন জহির রায়হানের ছেলে তপু রায়হান। তিনি বাইসাইকেল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হতে পারলে গুলশান বনানীকে পরিকল্পিত নগরায়ণে সাজাব। এখানে যেমন বিত্তশালী আছেন, তেমনি আছেন দরিদ্র মানুষও। তাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা আছে। সর্বোপরি নিরাপদ ঢাকা-১৭ করতে চাই।
এর বাইরে এখানে আরও কয়েকজন প্রার্থী হিসাবে আছেন।
জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে আতিক আহমেদ, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এস এম আবুল কালাম আজাদ, কামরুল হাসান নাসিম (বিজেপি) ও কাজী এনায়েত উল্লাহ (স্বতন্ত্র), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে মনজুর হুমায়ুন এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে শামীম আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আগের নির্বাচনের ফল স্বস্তিদায়ক নয় : অতীতে এই আসনে বিএনপির প্রার্থীদের জয়ের ইতিহাস খুব ভালো নয়। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে গুলশান-বনানী-ক্যান্টনমেন্ট-বাড্ডা-উত্তরা (ঢাকা-৫) এলাকা থেকে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী ডা. আ. রউফ। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এ কে এম রহমতউল্লাহ এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে এই আসন থেকে নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২৩ হাজার ৭৩ ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের সাহারা খাতুনকে। পরে খালেদা জিয়া ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির কামরুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আসনটিতে নৌকা নিয়ে জয় পান জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া এ কে এম রহমতউল্লাহ। তিনি ধানের শীষের কামরুলকে হারান ২৩ হাজার ভোটে। ২০০১ সালে আবার রহমতউল্লাহকে ৫৪ হাজার ভোটে হারিয়ে নির্বাচিত হন কামরুল।
২০০৮ সালে সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন আ স ম হান্নান শাহ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত এই সদস্য তখন হেরে যান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে। ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে এরশাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হওয়ায় এক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে হারিয়ে বিজয়ী হন বিএনএফের আজাদ। ২০১৮ সালে অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান ফারুকের কাছে হেরে যান বিএনপির জোট শরিক আন্দালিভ রহমান পার্থ। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী আরাফাত জয়ী হন। মাঝে উপনির্বাচনেও তিনি আলোচিত হিরো আলমকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচিত কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বেশিরভাগই ছিলেন ঢাকার বাইরের ব্যক্তি। স্থানীয় প্রার্থী ছিলেন হাতে গোনা।
এফআর